• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১০ অপরাহ্ন

চাবাহার নিয়ে গভীর সঙ্কটে ভারত, ট্রাম্পের চাপে আত্মসমর্পণ করছেন মোদী?

ইনসাফ বার্তা আন্তর্জাতিক : / ৪৮ বার
আপডেট রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

গত কয়েকদিন ধরেই ভারত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এমনকী নেটদুনিয়া— সর্বত্র একটাই জল্পনা। ট্রাম্পের চাপে ভারত কি শেষমেশ ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হলো? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে যে দেশগুলির, তাদের বিরুদ্ধে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছেন। আর তার পরেই ইরানের চাবাহার বন্দরে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
এ বিষয়ে এক সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর মোদী সরকারকে আক্রমণ শুরু করেছে বিরোধীরা। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সাফাই দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে, কিন্তু তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— ধোঁয়াশা কি সত্যিই কাটল? নাকি পর্দার আড়ালে চলছে এক
এই মুহূর্তে চাবাহার বন্দর নিয়ে যে তোলপাড় চলছে, তার নেপথ্যে রয়েছে গত ১২ জানুয়ারির একটি ঘটনা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের সঙ্গে যারা ব্যবসা করবে, তাদের উপরে আমেরিকায় ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে। ইরানের উপরে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বা ‘স্যাংশন’ চাপানো নতুন কিছু নয়, কিন্তু ট্রাম্পের এই নতুন হুঁশিয়ারিতে বড় ধাক্কা খেয়েছে ভারত।
গত বৃহস্পতিবার ‘ইকনমিক টাইমস’-এর এক রিপোর্টে দাবি করা হয়, চাবাহার প্রকল্পে ভারতের দীর্ঘ এক দশকের প্রচেষ্টা কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে। এই রিপোর্টের পর থেকেই জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করে।
রিপোর্ট অনুযায়ী আমেরিকা নাকি ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরেই চাবাহার বন্দরের উপরে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। বিষয়টি সেই সময়ে জনসমক্ষে আসেনি। ভারতকে সেখানকার কাজকর্ম গুটিয়ে নেওয়ার জন্য ৬ মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬-এর ২৬ এপ্রিল সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে। অর্থাৎ চাবাহার থেকে মালপত্তর গুটিয়ে সরে য়াওয়ার জন্য ভারতের হাতে সময় রয়েছে আর মাত্র কয়েক মাস।
১২০ মিলিয়ন ডলারের রহস্য

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার বিপদটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল নয়াদিল্লি। তাই সেই খাঁড়া নেমে আসার আগেই চাবাহার প্রকল্পের জন্য প্রতিশ্রুত ১২০ মিলিয়ন ডলার ইরানে স্থানান্তরিত করেছিল ভারত সরকার। সরকারি সূত্রের খবর, নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়ে গেলে ব্যাঙ্কিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো অসম্ভব হতো। তাই তড়িঘড়ি এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পরে ভারত কি এখন নিঃশব্দে ‘এক্সিট রুট’ বা বেরোনোর রাস্তা খুঁজছে?
তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক
স্বাভাবিক ভাবেই, এমন স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে উত্তপ্ত ভারতেরর্ রাজনীতি। কংগ্রেস সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে ‘সারেন্ডর’ করার অভিযোগ করেছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, ট্রাম্পের চাপের মুখে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছেন মোদী। করদাতাদের ১২০ মিলিয়ন ডলার অর্থ কার্যত পানিতে গেল।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরার কটাক্ষ, আমেরিকার সামান্য চাপে ভারতের এই পিছিয়ে আসা, পররাষ্ট্রনীতির চরম ব্যর্থতা। তার প্রশ্ন, ‘কেন ভারতের পররাষ্ট্রনীতি হোয়াইট হাউসের অঙ্গুলিহেলনে চলবে?’
বিজেপি এই অভিযোগ ‘ডাহা মিথ্যা’ এবং ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিলেও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছিলেন, ‘২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চাবাহারে কাজ চালানোর জন্য আমেরিকার বৈধ অনুমতি বা ওয়েভার ভারতের হাতে রয়েছে। আমরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি যাতে এই মেয়াদ আরও বাড়ানো যায় এবং প্রকল্পটি সচল থাকে।’ অর্থাৎ, চাবাহার বন্দর যে হতছাড়া হতে পারে, তার ইঙ্গিত পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও রয়েছে।
কেন চাবাহার ভারতের ‘তুরুপের তাস’?
আমেরিকার সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩২ বিলিয়ন ডলার। অনেকেই মনে করতে পারেন, তার সামনে চাবাহার প্রকল্পের ১২০ মিলিয়ন ডলার কিছুই না। কাজেই আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি নিয়ে এই ইরানি বন্দর আঁকড়ে ধরে রাখার মানে নেই।
কিন্তু এই বন্দর যে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বারবারই বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আসলে ভারতের কাছে চাবাহার বন্দর কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র এবং ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে।
ভারতের জন্য চাবাহারের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো এর অবস্থান। আগে ভারত থেকে আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ায় পণ্য পাঠাতে গেলে আগে পাকিস্তানের উপরে নির্ভর করতে হতো। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।
বর্তমানে চাবাহার বন্দর ব্যবহার করে ভারত সরাসরি সমুদ্রপথে পণ্য ইরানে পাঠিয়ে, সেখান থেকে সড়ক ও রেলপথে আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় পৌঁছে দিতে পারে। অর্থাৎ, পাকিস্তানকে এড়িয়ে এটি ভারতের জন্য এক স্বাধীন বাণিজ্যের দুয়ার।
চীন-পাকিস্তান অক্ষের মোকাবিলা

চাবাহার শুধুমাত্র একটি বন্দর নয়, একে আরব সাগরে ভারতের নিরাপত্তা চৌকিও বলা যায়। এখান থেকে মাত্র ১৭০ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে পাকিস্তানের গদর বন্দর। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে সেখানে ঘাঁটি গেড়েছে চীন। আরব সাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
চাবাহারে ভারতের উপস্থিতি মানে গদরের উপরে নজরদারি এবং আরব সাগরে চীনের একাধিপত্যে ভাগ বসানোর সুযোগ। প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবালের মতে, ‘ভারত যদি চাবাহার ছেড়ে দেয়, তবে সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে চীন ও পাকিস্তান। যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ হবে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ

চাবাহারকে বলা হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর’ বা INSTC-এর হৃৎপিণ্ড। এই করিডর মুম্বইকে ইরান হয়ে রাশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করে। সুয়েজ খালের উপরে নির্ভরতা কমাতে এবং কম খরচে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে এই রুট ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ২০২৪ সালেই ভারত ও ইরান ১০ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যার ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারে।
তবে সরকারি সূত্রের খবর, ভারত এখনই হাল ছাড়ছে না। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময় আছে। নয়াদিল্লি এখন আলোচনার টেবিলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কতটা দর কষাকষি করতে পারে, তার উপরেই নির্ভর করছে আরব সাগরে ভারতের এই স্বপ্নের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। তবে এটুকু নিশ্চিত, চাবাহার আর নিছক একটি বন্দর নয়। এটি এখন ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের এক বড় অগ্নিপরীক্ষা এবং মোদী সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার চূড়ান্ত লিটমাস টেস্ট। সূত্র: টিওআই।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরোও

Archive Calendar

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031