
চীন তার পঞ্চম প্রজন্মের জে-২০এ দূরপাল্লার এয়ার সুপিরিওরিটি (আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সক্ষম) যুদ্ধ বিমানের উৎপাদন বড় পরিসরে বৃদ্ধি করছে। সম্প্রতি চীনা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত নতুন কিছু ফুটেজে একটি জে-২০এ যুদ্ধবিমানকে ফ্যাক্টরির হলুদ প্রাইমার (প্রাথমিক রঙ) লাগানো অবস্থায় দেখা গেছে। এটি নির্দেশ করে যে বিমানটি সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে এবং এতে নতুন প্রজন্মের টুইন (দুটি) ডব্লিউএস-১৫ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে প্রথমবারের মতো নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, ডব্লিউএস-১৫ ইঞ্জিন বিশিষ্ট জে-২০ বিমানের প্রথম ব্যাচটির সিরিয়াল উৎপাদন (ধারাবাহিক উৎপাদন) সম্পন্ন হয়েছে। এই ইঞ্জিনসহ কোনো সিরিয়াল প্রোডাকশন ফাইটারের প্রথম সফল উড্ডয়নটি ঘটেছিল গত ২৭শে ডিসেম্বর। ব্লিউএস-১৫ ইঞ্জিনটি সম্পূর্ণ নতুন এবং মৌলিক একটি ডিজাইন; এটি আগের কোনো ইঞ্জিনের উন্নত সংস্করণ বা ডেরিভেটিভ নয়। ফলে চীনা সামরিক বিমান শিল্পের জন্য এই ইঞ্জিনের অন্তর্ভুক্তি একটি মস্ত বড় মাইলফলক।
বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সর্বশেষ মৌলিক ফাইটার ইঞ্জিন ছিল 'এফ১১৯'। ১৯৯০ সালে এটির প্রথম উড্ডয়ন পরীক্ষা করা হয় এবং প্রায় ৩০ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে এটি সিরিয়াল প্রোডাকশন ফাইটারগুলোতে যুক্ত করা শুরু হয়। এরপর থেকে আমেরিকার তৈরি পরবর্তী সব ইঞ্জিনই মূলত এই নকশা বা তার চেয়েও পুরনো কোনো নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
জে-২০ বিমানের মূল উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান 'চেংডু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ' গত জানুয়ারিতে একটি ফুটেজ প্রকাশ করে। সেখানে প্রথমবারের মতো ডব্লিউএস-১৫ ইঞ্জিনসহ বেশ কয়েকটি নতুন বিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করতে দেখা যায়। জে-২০ বিমানে এই ইঞ্জিনের সংযোজন বহুদিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রথম একটি ডব্লিউএস-১৫ ইঞ্জিন যুক্ত করে জে-২০ এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন চালানো হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুনে দুটি ইঞ্জিন একযোগে যুক্ত করে প্রথম ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।
এই নতুন ইঞ্জিনটি জে-২০ বিমানের উড্ডয়ন ক্ষমতা এবং রেঞ্জ (দূরত্ব অতিক্রমের ক্ষমতা) সব দিক থেকেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। একই সাথে এটি বিমানের অন-বোর্ড সাব-সিস্টেমগুলোতে আরও বেশি শক্তি সরবরাহ করতে পারে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বেশ কম। বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত সবচেয়ে অত্যাধুনিক ফাইটার ইঞ্জিনগুলোর একটি হলো এই ডব্লিউএস-১৫। এর 'থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও' (ওজন ও শক্তির অনুপাত)-র সাথে তুলনা করা যায় কেবল আমেরিকার পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ ফাইটারকে শক্তি জোগানো 'এফ১৩৫' ইঞ্জিনের। এই ইঞ্জিনের উচ্চ কার্যক্ষমতা জে-২০ এর উড্ডয়নসীমাকে এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে, এটি রাশিয়ার বিশাল আকৃতির 'সু-৩৪' এর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ পাল্লার যুদ্ধবিমানে পরিণত হয়েছে।
উন্নত জে-২০এ বিমান এবং এর নতুন ইঞ্জিনের এই ধারাবাহিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময়কালটি চীনের জে-২০ উৎপাদন স্কেল ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির সাথে মিলে যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে, চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হয়তো এই যুদ্ধবিমানটিকে আরও উচ্চতর ও আধুনিক মানে নিয়ে যাওয়ার পরই এর পেছনে বড় বিনিয়োগ ও ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল। এমন ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়; এর আগে ২০২১ সালেও যখন জে-২০ এর নকশায় বড় পরিবর্তন এনে ডব্লিউএস-১০সি ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়েছিল, তখনও এর উৎপাদন অনেক বাড়ানো হয়েছিল।
ব্রিটিশ থিংক-ট্যাঙ্ক 'রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট' (রুশি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, উৎপাদনের এই বিশাল সম্প্রসারণের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে চীনা বিমান বাহিনীতে প্রায় ১,০০০টি জে-২০ যুদ্ধবিমান যুক্ত হবে। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ১২০টি করে এই ফাইটার জেট উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা বাহিনী তাদের কোনো যুদ্ধবিমান এত বিপুল সংখ্যায় তৈরি বা সংগ্রহ করছে না। এই বিশাল বিনিয়োগ এবং জে-২০ এর বিশ্বসেরা সক্ষমতা—সব মিলিয়ে আকাশযুদ্ধের ক্ষেত্রে চীনা বিমান বাহিনীর আধিপত্য ও সুবিধাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদনে থাকা ডব্লিউএস-১০সি ইঞ্জিনগুলোকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে এই নতুন ডব্লিউএস-১৫ ইঞ্জিন, এবং সম্ভবত ইতিমধ্যেই তা শুরু হয়ে গেছে। তথ্যসূত্র: মিলেটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন