
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচন সাম্প্রতিক দশকের ‘সবচেয়ে নাটকীয়’ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের মিডটার্ম নির্বাচনে শুধু ভোট নয়, বরং ভোটের মানচিত্রও নির্ধারণ করতে পারে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে।
আল-জাজিরার এক ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদনে ভোট মানচিত্রের পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ‘নাটকীয়’ মধ্যবর্তী নিম্নকক্ষ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে নিম্নকক্ষের প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে ভোট হবে। পাশাপাশি উচ্চকক্ষ অর্থাৎ সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনেও ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় দেড় বছর আগে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। এরপর রিপাবলিকানরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা তাদের আইন পাস ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, ফলে রিপাবলিকানদের জন্য এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো নির্বাচনী এলাকার মানচিত্র পরিবর্তন বা ‘রিডিস্ট্রিক্টিং’। এতে কোন এলাকায় কোন ভোটার থাকবে তা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। এই মানচিত্র পরিবর্তনের ফলে কোন দল কতটি আসনে জয়ী হতে পারে, তা সরাসরি প্রভাবিত হয়।
এ প্রক্রিয়াকে অনেক সময় ‘জেরিম্যান্ডারিং’ বলা হয়—যেখানে নির্বাচনী সীমানা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে একটি দল অন্য দলের তুলনায় বেশি সুবিধা পায়।
ভিজ্যুয়াল গাইডে আরও দেখানো হয়েছে কীভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচন কাজ করে, প্রাইমারি ভোট কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচনী মানচিত্র রাজনৈতিক ফলাফলে কীভাবে প্রভাব ফেলে।
মধ্যবর্তী সময়ে কী হয়
৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৪ কোটি ৪০ লাখ ভোটার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। এটি নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট নয়। এই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুইটি কক্ষ— সিনেট (উচ্চকক্ষ) এবং প্রতিনিধি পরিষদ (নিম্নকক্ষ)— নতুন করে গঠিত হয়। এছাড়া ৩৯টি রাজ্যে গভর্নর এবং রাজ্য আইনসভার সদস্যরাও নির্বাচিত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে মোট ১০০টি আসন থাকে। প্রতিটি রাজ্য থেকে জনসংখ্যা যাই হোক না কেন, ২ জন করে সিনেটর থাকেন। সিনেটরদের মেয়াদ ৬ বছর, তাই প্রতি নির্বাচনে শুধু প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।
অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে মোট ৪৩৫ জন সদস্য থাকেন। এখানে প্রতিটি রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন নির্ধারণ করা হয় এবং সদস্যদের মেয়াদ ২ বছর। তাই প্রতি দুই বছর পরপর পুরো প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা খুব অল্প ব্যবধানে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল— ২২০টি আসন বনাম ডেমোক্র্যাটদের ২১৫টি আসন। এই ব্যবধান খুবই কম, যা ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে কম।
এই অল্প ব্যবধানের কারণে এবার নির্বাচনী আসনের মানচিত্র পুনর্বিন্যাস (রিডিস্ট্রিক্টিং) এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ কয়েকটি আসনের ফলই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে।
প্রাথমিক নির্বাচনের সময় কী হয়
নভেম্বরের মূল নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী ঠিক করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘প্রাথমিক নির্বাচন’। প্রাইমারি হলো দলের ভেতরের প্রতিযোগিতা। একই দলের একাধিক প্রার্থী লড়াই করেন কে সাধারণ নির্বাচনে দলের প্রতিনিধিত্ব করবে তা ঠিক করার জন্য।
এই নির্বাচন মার্চ থেকে শুরু হয়ে গ্রীষ্ম পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিভিন্ন রাজ্যে হয়। যেসব এলাকায় একটি দল খুব শক্তিশালী, সেখানে প্রাথমিক নির্বাচন বেশি গুরুত্বপূর্ণ । কারণ সেখানে নভেম্বরের মূল নির্বাচনে খুব বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না, ফলে আসল লড়াই অনেক সময় প্রাথমিকেই হয়।
প্রাথমিক নির্বাচন অনেক সময়ই ঠিক করে দেয় একটি দলের রাজনৈতিক দিক ও আদর্শ কী হবে, কারণ ভোটাররা দলের ভেতর থেকে কোন ধরনের প্রার্থী চান তা এখানেই বেছে নেন।
সম্প্রতি আলাবামা, জর্জিয়া, আইডাহো, কেন্টাকি, ওরেগন এবং পেনসিলভেনিয়াসহ ছয়টি রাজ্যে প্রাইমারি নির্বাচন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নকক্ষের ৪৩৫টি আসনের মানচিত্র কীভাবে তৈরি হয়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি আসন রয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজ্যকে ঠিক করতে হয় কোন এলাকা কোন আসনের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নির্বাচনী জেলা নির্ধারণ।
এই মানচিত্র ঠিক করে দেয়— কোন ভোটার কোন জেলায় ভোট দেবেন, কোন জেলা কোন দলের দিকে ঝুঁকে আছে এবং কোন আসন নিরাপদ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় পুনর্বিন্যাস।
প্রতি ১০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে জনগণনা করা হয়। এতে জনসংখ্যা কোথায় বেড়েছে বা কমেছে তা নির্ধারণ করা হয়। সেই অনুযায়ী রাজ্যগুলোর আসন সংখ্যা আবার ঠিক করা হয় এবং প্রতিটি রাজ্য নিজেদের জেলার সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করে।
১৯১২ সাল থেকে নিম্নকক্ষে ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন হয় । পরে ১৯২৯ সালে আলাস্কা ও হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার পর এই সংখ্যা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়।
সর্বশেষ জনগণনা হয়েছিল ২০২০ সালে এবং ২০২২ সালের মধ্যে নতুন মানচিত্র তৈরি করা হয়। তবে ২০২৪ সালের পর কিছু রাজ্যে আবারও নতুন করে মানচিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে— যার কিছু আদালতে আটকে গেছে, আবার কিছু অনুমোদন পেয়েছে।
অনেক সময় এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যাকে বলা হয় জেরিম্যান্ডারিং— অর্থাৎ কোনো দলকে সুবিধা দিতে ইচ্ছেমতো জেলার সীমানা তৈরি করা।
জেরিম্যান্ডারিং কী
জেরিম্যান্ডারিং হলো এমন একটি রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে নির্বাচনী জেলার সীমানা এমনভাবে বদলানো হয় যাতে একটি নির্দিষ্ট দল বেশি আসন জিততে পারে। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় জেলা-ভিত্তিক ভোটিং ব্যবস্থায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে।
এই শব্দটির উৎপত্তি ১৮১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে। তখন গভর্নর এলব্রিজ গেরি একটি অদ্ভুত আকৃতির জেলা অনুমোদন করেন। একটি সংবাদপত্র সেই জেলার আকৃতি সালাম্যান্ডার প্রাণীর সাথে তুলনা করে, আর সেখান থেকেই নাম হয় “জেরিম্যান্ডারিং”।
জেরিম্যান্ডারিংয়ের দুটি প্রধান ধরন—
১) প্যাকিং : একই দলের ভোটারদের কয়েকটি জেলায় একসাথে জড়ো করে রাখা হয়, যাতে তারা কিছু জায়গায় বেশি ভোট পেলেও অন্য জায়গায় প্রভাব ফেলতে না পারে।
২) ক্র্যাকিং : একই দলের ভোটারদের অনেক জেলায় ভাগ করে দেওয়া হয়, যাতে তারা কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে না পারে।
এই কৌশলগুলো নির্বাচনের ফল আগেই অনেকটা প্রভাবিত করতে পারে, তাই এটি নিয়ে সবসময় বিতর্ক থাকে।
কোন রাজ্যগুলো মানচিত্র বদলেছে
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, মিসৌরি, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, টেনেসি, টেক্সাস এবং উটাহ রাজ্য নতুন কংগ্রেশনাল মানচিত্র বা নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাসের অনুমোদন করেছে।
তবে এসব পরিবর্তন সব জায়গায় সহজ হয়নি। কোথাও মামলা হয়েছে, কোথাও আদালত আটকে দিয়েছে। বিশেষ করে কিছু রাজ্যে অভিযোগ উঠেছে যে এই মানচিত্র রাজনৈতিক সুবিধা বা বর্ণভিত্তিক ভারসাম্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে তৈরি।
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী মানচিত্র নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই চলছে।
আরও পড়ুন
হজ চলাকালীন ইরানে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা ট্রাম্পের
ফ্লোরিডার নতুন নির্বাচনী এলাকা : রিপাবলিকানদের সুবিধা বাড়ানোর অভিযোগ
ফ্লোরিডার নতুন নির্বাচনী এলাকা অনুযায়ী, রাজ্যের ২৮টি প্রতিনিধি পরিষদের আসনে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য আরও প্রায় চারটি এমন আসনে জেতার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেসব এলাকায় ভোটাররা সাধারণত রিপাবলিকান প্রার্থীদের বেশি সমর্থন দিয়ে থাকে।
আগের মানচিত্রেও রিপাবলিকানদের কিছুটা সুবিধা ছিল। তবে তখন ডেমোক্র্যাট ভোটাররা বিশেষ করে মায়ামি, অরল্যান্ডো, টাম্পা এবং দক্ষিণ ফ্লোরিডার মতো শহর এলাকায় বেশি সংখ্যায় একসাথে থাকত।
নতুন মানচিত্রে বলা হচ্ছে, এই ডেমোক্র্যাট ভোটারদের বিভিন্ন জেলায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা এক জায়গায় বেশি প্রভাব ফেলতে না পারে। একই সঙ্গে মধ্য ও দক্ষিণ ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য কিছু নির্বাচনী জেলার সীমানাও বদলে বড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
এই নতুন মানচিত্রে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস স্বাক্ষর করে এটিকে আইনে পরিণত করেছেন। তবে ভোটাধিকার রক্ষা করা সংগঠন এবং ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি ফ্লোরিডার ‘ফেয়ার ডিস্ট্রিক্টস’ (ন্যায্য জেলা গঠন) সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী ভঙ্গ করে এবং রাজনৈতিকভাবে রিপাবলিকানদের সুবিধা দেওয়ার জন্য মানচিত্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।
টেক্সাসে পুনর্বিন্যাস নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই
টেক্সাসে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নির্বাচনী আসনের মানচিত্র (পুনর্বিন্যাস) নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক লড়াই চলছে। এই রাজ্যকে এই লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে টেক্সাসে প্রতিনিধি পরিষদের আসনে রিপাবলিকানদের বড় সুবিধা আছে— ২৫টি আসন তাদের দখলে, আর ডেমোক্র্যাটদের আছে ১৩টি আসন।
গত ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রিপাবলিকানদের তৈরি ২০২০ সালের পরের নির্বাচনী মানচিত্রটি আবার চালু করার অনুমতি দেয়। এর আগে একটি নিম্ন আদালত এই মানচিত্রটি স্থগিত করেছিল, কারণ এতে বর্ণভিত্তিক পক্ষপাত (জেরিম্যান্ডারিং) এবং ভোটাধিকার আইন ভাঙার অভিযোগ উঠেছিল।
এই মানচিত্রের বিরুদ্ধে আবারও নতুন করে মামলা হয়েছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন, লিগ অব ইউনাইটেড ল্যাটিন আমেরিকান সিটিজেনস এবং মেক্সিকান আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স অ্যান্ড এডুকেশনাল ফান্ডসহ কয়েকটি নাগরিক অধিকার সংগঠন ফেডারেল আদালতে এই মামলা করেছে।
তাদের অভিযোগ, এই মানচিত্রে সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রভাব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ভোটাধিকার আইন ভঙ্গ করা হয়েছে। তাদের আরও দাবি, এটি একটি রাজনৈতিকভাবে এক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
মিসৌরির নতুন নির্বাচনী এলাকা
মিসৌরিতে রিপাবলিকানরা ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনী এলাকা (নির্বাচনী আসনের পুনর্বিন্যাস) পরিবর্তন করে তাদের দলের জন্য আরও একটি হাউস আসন পাওয়ার চেষ্টা করেছে।
সেপ্টেম্বরে রাজ্যের রিপাবলিকানরা একটি নতুন মানচিত্র অনুমোদন করেন, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে তাদের ইতিমধ্যে থাকা শক্ত অবস্থান আরও মজবুত করা। এই পুনর্বিন্যাসের আগে মিসৌরির ৮টি কংগ্রেসনাল আসনের মধ্যে ৬টিতে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধিত্ব করছিল।
এরপর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক কেহো নতুন মানচিত্রে স্বাক্ষর করে এটিকে আইনে পরিণত করেন, যা ২০২৬ সালের নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে।
নতুন সীমানা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে রিপাবলিকানদের জন্য অনুকূল আসনগুলো আরও নিরাপদ হয়ে যায় এবং ডেমোক্র্যাটদের জন্য কিছু এলাকায় জেতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই মানচিত্রের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ উঠেছিল, তবে মিসৌরি সুপ্রিম কোর্ট সেটি বহাল রাখে। এর ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই নতুন মানচিত্র ব্যবহার করার পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।
নর্থ ক্যারোলিনায় নতুন নির্বাচনী এলাকা : রিপাবলিকান আসন বাড়ার সম্ভাবনা
নর্থ ক্যারোলিনায় নতুন নির্বাচনী আসনের পুনর্বিন্যাস অনুমোদন করা হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।
অক্টোবরে রাজ্যের সিনেট এই নতুন মানচিত্র অনুমোদন করে। এতে কয়েকটি আগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে থাকা আসন পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর ফলে একটি অতিরিক্ত আসন রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগের মানচিত্রে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন মূলত শার্লট, রালে, ডারহাম এবং গ্রিনসবোরোর মতো বড় শহর ও শহরতলিতে বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। অন্যদিকে রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় রিপাবলিকানদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
নতুন মানচিত্রে পূর্বাঞ্চল ও শহরতলির কিছু জেলার সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জেলা এখন রিপাবলিকানদের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হয়ে যেতে পারে। তবে শহরকেন্দ্রিক কিছু জেলা আগের মতোই রয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এসেছে, যখন নর্থ ক্যারোলিনায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী আসনের পুনর্বিন্যাস নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মানচিত্র রাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন নির্বাচনী এলাকা : ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্ত করার উদ্যোগ
ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন নির্বাচনী এলাকা (কংগ্রেসনাল জেলা) পুনর্বিন্যাস করে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি দল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসে, যেখানে ৫২টি হাউস আসন রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে চলা পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ায় ক্যালিফোর্নিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২৫ সালে একটি বিশেষ নির্বাচনে ভোটাররা “ইলেকশন রিগিং রেসপন্স অ্যাক্ট” নামে পরিচিত প্রস্তাব ৫০-এর অধীনে নতুন মানচিত্র অনুমোদন করেন। এই মানচিত্রটি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনে তৈরি হয়েছে।
নতুন জেলা সীমানা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের বর্তমানে থাকা ৪৩টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকে এবং ভবিষ্যতে সেই অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে বিভক্ত— লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো এবং সান দিয়েগোর মতো উপকূলীয় শহরগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বেশি। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সাধারণত অভ্যন্তরীণ ও গ্রামীণ এলাকায় বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ওহাইওর নতুন নির্বাচনী এলাকা : রিপাবলিকান প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা
ওহাইওতে নতুন নির্বাচনী এলাকার (কংগ্রেসনাল জেলা) পুনর্বিন্যাস অনুমোদন করা হয়েছে, যা রিপাবলিকানদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজ্যটি এই নতুন জেলা মানচিত্র তৈরি করেছে। ২০১৮ সালের একটি সাংবিধানিক সংশোধনের কারণে ওহাইওতে নিয়মিতভাবে নির্বাচনী জেলার সীমানা পুনর্গঠন করতে হয়।
অক্টোবরে ওহাইও রিডিস্ট্রিক্টিং কমিশন সর্বসম্মতভাবে এই নতুন মানচিত্র অনুমোদন করে। এতে রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকায় রিপাবলিকানদের অবস্থান আগের মতোই বজায় থাকে এবং কিছু শহরতলি ও গ্রামীণ জেলা আরও রিপাবলিকানদের জন্য নিরাপদ করা হয়েছে।
রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন মূলত ক্লিভল্যান্ড, কলম্বাস এবং সিনসিনাটির মতো বড় শহরগুলোতে বেশি কেন্দ্রীভূত।
আগে ওহাইওকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেট (যেখানে কোনো একটি দল নিশ্চিতভাবে শক্তিশালী নয়) হিসেবে ধরা হতো। তবে এখন সেখানে রিপাবলিকানদের প্রভাব বেড়েছে। বর্তমানে রাজ্যের ১৫টি হাউস আসনের মধ্যে ১০টি রিপাবলিকানদের দখলে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন নির্বাচনী এলাকার মানচিত্র রাজনৈতিক ভারসাম্যকে আরও রিপাবলিকানদের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা