
বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী নদী ‘লোভা’। দিনের আলোয় এ নদীতে বিরাজ করে সুনসান নীরবতা। সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। অন্ধকারে শান্ত নদীপথে হঠাৎ নৌ-চলাচলের হুলুস্থূল পড়ে যায়। কার আগে কে পাড়ি দেবে, এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ তৎপরতা আরও বাড়তে থাকে। আর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তা থেমে যায়। সকাল হতেই আবার সুনসান হয়ে পড়ে নদী–যেন রাতে কিছুই হয়নি।
এ দৃশ্য সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া চা-বাগানসংলগ্ন লোভা নদীর জিরো পয়েন্ট এলাকার। সীমান্তবর্তী এই নদীপথে রাতভর চলে চোরাচালান। স্থানীয় ভাষায় চোরাচালানকে বলা হয় ‘বুঙ্গার কারবার’। আর নদীপথে সংঘটিত চোরাচালানকে স্থানীয়রা নাম দিয়েছেন ‘বুঙ্গার বাইচ’।
লোভা নদীর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো পয়েন্ট (শূন্যরেখা) এলাকার বুঙ্গার বাইচের একটি ভিডিও হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, দিনের বেলায় নদীপথ অনেকটাই নির্জন থাকলেও রাত নামলেই জমে ওঠে চোরাচালানের প্রতিযোগিতা।
টানা তিন দিন লোভা নদীর শূন্যরেখা ও আশপাশের এলাকায় নজরদারিতে দেখা গেছে, ছোট নৌকা ও ইঞ্জিনবিহীন ট্রলারে করে আনা হয় শত শত জিরার বস্তা।
লোভাছড়া ছাড়াও সিলেটের বাংলাবাজার, জৈন্তাপুর, সুরাইঘাট ও গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন অংশ দিয়ে জিরা ঢোকার তথ্য মিলেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সমন্বিত পদক্ষেপের কথা ভাবছে। বিজিবির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হবে।
উজান-ভাটির স্রোতে সচল চোরাই রুট
বর্ষায় ওপারে ভারী বৃষ্টি হলে লোভা নদী ফুলেফেঁপে ওঠে। তখন এ নদীর সঙ্গে সুরমাসহ আশপাশের জলপথ মিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে একাধিক বিকল্প নৌরুট তৈরি হয়। আর পানির বিস্তার ও স্রোত বাড়ায় সীমান্তের অনেক অংশে নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে সীমান্তের দুই পাড়ের চোরাকারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এদিকে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে মসলার বাজারে জিরার চাহিদা বেড়েছে। আর এই চাহিদাকে পুঁজি করে বর্তমানে বুঙ্গার বাইচে সবচেয়ে বেশি আসছে ভারতীয় জিরা। আর এই জিরা-চোরাচালানকে কেন্দ্র করে লোভা নদী এলাকায় প্রতি রাতে তৈরি হয় রমরমা পরিস্থিতি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এলাকা থেকে প্রথমে জিরার বস্তা নদীর তীরে আনা হয়। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো নৌকায় তুলে বাংলাদেশে ঢোকানো হয়। লোভা নদী কানাইঘাটের একাংশে বড় বাঁক নিয়ে সুরমা নদীতে মিশেছে। জিরো পয়েন্ট পেরিয়ে চোরাকারবারিরা সুরমায় পৌঁছে গেলে নিরাপদে নৌপথ ব্যবহার করতে পারছে। অনেক ক্ষেত্রে নদীর মাঝপথেই পণ্য হাতবদল হয়ে যায়।
লোভা নদীর রাতের ভিডিওসূত্রে এক ‘বুঙ্গা কারবারির’ সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, লোভা নদীর তীরবর্তী পাথরমহাল চালুর তোড়জোড় শুরু হওয়ায় একটি চক্র সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে বুঙ্গার কারবার আরও উন্মুক্ত করেছে।
‘পিক টাইম’ সারা রাত
লোভাছড়া চা-বাগানসংলগ্ন নদীপথ বর্তমানে জিরা চোরাচালানের অন্যতম ‘পিক পয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। দিনের বেলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকেই বাড়তে থাকে অচেনা নৌকার চলাচল।
স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ি বনাঞ্চল ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক এলাকায় কার্যকর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে এক স্থান থেকে আরেক স্থান দেখা যায় না। ফলে চোরাকারবারিরা সহজে অবস্থান বদল করতে পারে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সীমান্ত পার হওয়ার পর চোরাই জিরা স্থানীয় গুদাম কিংবা অস্থায়ী স্টকপয়েন্টে মজুত রাখা হয়। পরে তা সিলেট নগরীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
লোভা নদীর এ অংশটি ১৯ বিজিবির আওতাধীন। বিজিবির সাম্প্রতিক চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ঘেঁটে দেখা গেছে, জব্দ হওয়া চোরাইপণ্যের মধ্যে জিরার চালান উল্লেখযোগ্য এবং অধিকাংশ অভিযানের সিজার মূল্য কোটি টাকার ওপরে।
বিজিবির একটি সূত্র জানায়, গত ১৮ মে গোয়াইনঘাটের সোনাটিলায় বিএসএফ-বিজিবির গুলিবিনিময়ের ঘটনার পর ৪৮ বিজিবির আওতাধীন সীমান্তে বিশেষ সতর্কতা জারি রয়েছে। এর প্রভাবেই ১৯ বিজিবির আওতাধীন লোভা নদীর জিরো পয়েন্টে ‘বুঙ্গার বাইচ’ বেড়ে গেছে। অবশ্য ৪৮ বিজিবির এলাকাধীন সীমান্তের আটটি স্পট থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার টহল দলের অভিযানে ভারতীয় জিরাসহ ৭২ লাখ টাকার চোরাইপণ্য জব্দ করা হয়েছে।
দামের তারতম্যে জিরার জোয়ার
ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, ভারতে জিরার দাম বাংলাদেশের তুলনায় কম। এ ছাড়া অবৈধ পথে আসায় জিরার কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে চোরাই জিরা বাজারে কম দামে বিক্রি করা যায়। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বৈধ আমদানিকারক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ভারতে প্রতি কেজি জিরার দাম প্রায় ৩৪৮ টাকা। বাংলাদেশে একই জিরা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অধিকাংশ চালানে ‘অমৃতবাজার’ নামের ভারতীয় ব্র্যান্ড দেখা গেলেও সীমান্ত পেরিয়ে বস্তা খোলার পর তা বাংলাদেশি জিরা হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে মসলার বাজার চাঙ্গা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিরার চাহিদাও বাড়ছে। আর এই সুযোগে অধিক মুনাফার আশায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাকারবারিরা। সীমান্ত এলাকায় রাতারাতি গড়ে উঠছে নতুন বহনকারী ও মজুতদার চক্র।
ধরার পরও আসামি অজ্ঞাত
সিলেট নগরীর নাইওরপুল এলাকায় একটি কুরিয়ার কোম্পানির কার্যালয়ের সামনে থেকে গত ১৪ মে প্রায় ১০ লাখ টাকার ভারতীয় জিরা আটক করে জনতা। পরে পুলিশ তা জব্দ করে। ওই জিরার চালানের মালিক দাবি করেন আব্দুস সাত্তার সালেহ মিন্টু নামের এক ব্যক্তি। তবে এ বিষয়ে তিনি বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। পরে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শিপলু চৌধুরী বলেন, ‘এসএ পরিবহন’-এর সামনে অভিযান চালিয়ে জিরার চালানটি জব্দ করা হয়।
পুলিশসূত্র জানায়, অভিযানে ঢাকা মেট্রো-ন-১৭-৮০৪৮ নম্বরের একটি পিকআপ থেকে ৭০ বস্তায় মোট ২ হাজার ১০০ কেজি ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
ধরার পরও মামলায় আসামি অজ্ঞাত, এ প্রসঙ্গে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘ওই ব্যক্তি জিরার মালিকানা প্রমাণে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। পরে তিনি নিজেও মালিকানার দাবি থেকে সরে যান। তাই তাকে আসামি করা হয়নি। তদন্তে প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিকারে টাস্কফোর্সের অভিযান
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সীমান্ত এলাকায় চোরাই চিনির বিস্তার রোধে যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এবার জিরা চোরাচালান ঠেকাতেও সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ বিষয়ে গত বুধবার কথা হয় ১৯ বিজিবির (জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন) পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুবায়ের আনোয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুধু লোভাছড়া নয়, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, বাংলাবাজার ও সুরাইঘাট এলাকা দিয়েও জিরা আসছে। গত দুই দিন এসব এলাকা দিয়ে প্রচুর পরিমাণ জিরা এসেছে। আমিও সরাসরি অভিযানে গিয়েছি। সীমান্তের প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকা ধরে অভিযান পরিচালনা করেছি।
তিনি আরও বলেন, এসব এলাকায় কোথাও কোথাও এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে এক স্থান থেকে আরেক স্থান দেখা যায় না। তার পরও অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মোবাইল টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালালে চোরাচালান অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন বিজিবির এই অধিনায়ক। তার ভাষ্য, ‘সীমান্তে দেশের সাধারণ মানুষও থাকে। ফলে ফায়ারিংয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সতর্ক থাকতে হয়। আগের কিছু ঘটনার পর এখন আরও বেশি সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে।
ঈদকে কেন্দ্র করেই শুধু জিরা আসছে এমন নয় জানিয়ে তিনি বলেন, আগেও জিরা আসত। এখন নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় চোরাচালান কিছুটা বেড়েছে। পানি না থাকলে এই রুট ততটা কার্যকর থাকে না। লোভাছড়া এলাকায় দ্রুত টাস্কফোর্স গঠনের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
শিগগিরই টাস্কফোর্স অভিযান শুরু হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।