
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনের ইতিহাসে একটি পরিচিত নাম তোফায়েল আহমেদ। তার রয়েছে বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন। তিনি ১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় লাভ করেন । এরপর দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ভোলা সদর উপজলোর দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর ও রাজনৈতিক সচিব। তবে রাজনৈতিক সচিব হলেও মূলত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তোফায়েল আহমেদ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথম এমএনএ পদ লাভ করেন।
বঙ্গবন্ধু উপাধিকারী এই নেতা ’৬৯-এর গনঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯৬ এ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ আওয়ামী লীগের সকল আন্দোলন সংগ্রামে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে ভোলা জেলা সদর আসনসহ ভোলার ৪টি আসনের ৭ উপজেলায় আওয়ামী লীগের পক্ষে দলকে সাংগঠনিকভাবে গড়ে তুলেছেন। তার নেতৃত্বে ভোলার অন্য আসনগুলোতেও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। গত ১৫ বছরে দলীয় কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি দলীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখতে সাহায্য করেছে।
শুধু রাজনীতিই নয় ভোলার উন্নয়নেও তার অবদান জনস্বীকৃত। বিশেষ করে ব্লক ও জিও ব্যাগ স্থাপনে ভোলাকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হলেও এই বর্ষীয়ান নেতা গ্যাস- বিদ্যুৎ সমৃদ্ধ জেলাকে ভোলা- বরিশাল ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে সারা দেশের সাথে সংযুক্ত করে তার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সনে ম্যাট্রিক পাশ করেন। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএসসি এবং বিএসসি পাশ করেন যথাক্রমে ১৯৬২ এবং ১৯৬৪ সনে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি পাশ করেন। কলেজজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হন ১৯৬২ সনে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪-তে ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র-সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫-তে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭-তে ইকবাল হল ছাত্র-সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সন পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা কর্মসূচি হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আর ১৯৬৯-এর ২৫ মার্চের মধ্যে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করে গৌরবের যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল। ১৯৬৯-এ তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ২ জুন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
আবাসিক হল ও ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সাহচর্যে আসেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ১৯৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা অতুলনীয়। ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ ও ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৭২-এ বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও বলবত্কৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া’য় তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
১৪ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৩-এ নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। ১৯৭৫-এ দেশের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ গঠিত হয়। বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাঁকে প্রথমে গৃহবন্দি ও পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তাঁকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
সাবেক এ মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ ৮২ বছরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মহান এ নেতার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন অনেকে।