
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিল শুধু একটি দল নয়, বরং একটি আবেগ, একটি ঐতিহ্যের নাম। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সেলেসাওরা প্রতিটি বিশ্বকাপেই শিরোপার দাবিদার হিসেবে মাঠে নামে। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকে সেই কাক্সিক্ষত ষষ্ঠ স্টারের দেখা পায়নি তারা। সাম্প্রতিক কয়েকটি আসরে ব্যক্তিনির্ভরতা, কৌশলগত সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভেঙে পড়ার প্রবণতা তাদের স্বপ্ন ভেঙেছে বারবার। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলকে ঘিরে আশাবাদের নতুন কারণ তৈরি হয়েছে। আক্রমণে বৈচিত্র্য, মধ্যমাঠে ভারসাম্য, রক্ষণে দৃঢ়তা এবং কার্লো আনচেলত্তির কৌশলগত নেতৃত্ব সব মিলিয়ে অনেকের চোখে এবারের ব্রাজিলই হতে পারে শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।
একসময় ব্রাজিলের আক্রমণ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নেইমার। প্রতিপক্ষও তাই সহজ সমাধান খুঁজে পেত নেইমারকে আটকে দিলেই ব্রাজিলের আক্রমণের ধার কমে যেত। গত চারটি বিশ্বকাপে সেই বাস্তবতা একাধিকবার দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান ব্রাজিল দল সেই নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনহা, এনড্রিক, রায়ান, থিয়াগো কিংবা দানিলোর মতো একাধিক খেলোয়াড় ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। ডান ও বাম দুপ্রান্ত থেকেই সমানভাবে আক্রমণ গড়ে তোলার সক্ষমতা রয়েছে দলের। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য একজন খেলোয়াড়কে ঘিরে পরিকল্পনা সাজানো আর যথেষ্ট নয়।
মধ্যমাঠেও আগের চেয়ে অনেক বেশি গভীরতা ও ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে। কাসেমিরোর অভিজ্ঞতা, ব্রুনো গিমারায়েসের কর্মক্ষমতা এবং আক্রমণ-রক্ষণে সংযোগ তৈরির ক্ষমতা ব্রাজিলকে আরও পরিণত করেছে। আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ নির্ভর করে মধ্যমাঠের ওপর, আর সেই জায়গায় বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ইউনিটগুলোর একটি গড়ে তুলেছে ব্রাজিল।
তবে শুধু আক্রমণ বা মাঝমাঠ নয়, বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম বড় শর্ত হলো শক্তিশালী রক্ষণভাগ। ফুটবলের বহুল প্রচলিত কথাই হলো আক্রমণ ম্যাচ জেতায়, কিন্তু শিরোপা জেতায় রক্ষণভাগ। ব্রাজিলের বর্তমান ডিফেন্স আগের কয়েকটি আসরের তুলনায় বেশি সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। অধিনায়ক মার্কিনিওসের নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং ডিফেন্স থেকে খেলা গড়ে তোলার দক্ষতা দলকে বাড়তি শক্তি দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্লো আনচেলত্তি। ব্রাজিলের ইতিহাসে মাত্র চতুর্থ বিদেশি কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ইতালিয়ান এই কিংবদন্তির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের হারিয়ে যাওয়া পরিচয় ফিরিয়ে আনা। ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করা আনচেলত্তি প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের এক সুতোয় গাঁথতে যেমন দক্ষ, তেমনি বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতাও তার বিশাল।
তার অধীনে ব্রাজিল মূলত ৪-২-৩-১ ও ৪-৩-৩ ফরমেশন নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে ৪-২-৩-১ ধীরে ধীরে দলের প্রধান কাঠামো হয়ে উঠেছে। বল দখলে রেখে আক্রমণ গড়া, দ্রুত পাস বিনিময়, তির্যক পাসের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা এবং সুযোগ তৈরি হলেই দ্রুত উল্লম্ব আক্রমণে রূপ নেওয়া এসবই আনচেলত্তির কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিল্ড-আপ পর্যায়ে ব্রাজিল প্রায়ই ২+২ কাঠামো ব্যবহার করে। দুই সেন্টার-ব্যাক চওড়া অবস্থান নিয়ে প্রতিপক্ষের প্রেসিং ছড়িয়ে দেয় এবং মাঝমাঠে পাসের নতুন পথ তৈরি করে। এরপর দ্রুত ওয়ান-টাচ পাস, ‘থার্ড-ম্যান’ কম্বিনেশন এবং ডায়াগোনাল পাসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের চাপ ভেঙে সামনে এগিয়ে যায় দলটি। এর ফলে ব্রাজিল শুধু বলের নিয়ন্ত্রণই ধরে রাখে না, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগেও দ্রুত ফাটল ধরাতে পারে।
আনচেলত্তির দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আক্রমণ ও রক্ষণের ভারসাম্য। বল ছাড়া অবস্থায় ব্রাজিল সাধারণত সংহত ৪-৪-২ রক্ষণাত্মক কাঠামোয় নেমে আসে। এতে মাঠের কেন্দ্রীয় অঞ্চল সুরক্ষিত থাকে এবং প্রতিপক্ষের জন্য ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বল পুনরুদ্ধার করলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ব্রাজিল দলটি আর কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানে একাধিক গোলদাতা আছে, অভিজ্ঞ ও কর্মঠ মিডফিল্ড আছে, সংগঠিত রক্ষণভাগ আছে এবং তাদের নেতৃত্বে আছেন বিশ্বের সবচেয়ে সফল কোচদের একজন। প্রতিভা ও কৌশলের এই সমন্বয়ই ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
বিশ্বকাপ জেতা কখনোই সহজ নয়। সাত ম্যাচের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যেখানে ছোট একটি ভুলও স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে। তবু বর্তমান দল, কৌশল এবং নেতৃত্ব বিবেচনায় বলাই যায় দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের জন্য ব্রাজিলের সামনে এবার সত্যিই একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে।