
জন্ম থেকেই নেই দুটি হাত। সেই শূন্যতাকে পেছনে ফেলে, পা দিয়েই কলম ধরে, খাতায় অক্ষর এঁকে, একে একে পেরিয়ে গেছেন এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি। সম্প্রতি মাস্টার্সেও প্রথম বিভাগ। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের আয়েশা আক্তারের গল্পটা প্রতিবন্ধকতা জয় করার এক জীবন্ত দলিল। অথচ এই মেয়েটিকেই একসময় সার্কাসে বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তার বাবা। অভাবের সংসারে প্রতিবন্ধী মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু আয়েশা নিজেই বদলে দিয়েছেন সেই ভাগ্যলিখন।
১৯৯৩ সালে সাঘাটা উপজেলার পূর্ব কচুয়া গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম আয়েশার। জন্মগতভাবে দুটি হাত না থাকায় শুরু থেকেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান বাবা আব্দুল লতিফ ও মা ফাতেমা বেগম। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হবে- এই আশঙ্কা থেকেই আয়েশা নিজে নিজে চেষ্টা শুরু করেন পা দিয়ে কাজ করার। ধীরে ধীরে রপ্ত করেন কাঁথা সেলাই, রান্না করা, গোসল করা, মোবাইল ফোন চালানো, এমনকি ল্যাপটপ ব্যবহারের মতো কাজও। সবকিছুই এখন তিনি করেন একা, কারও সাহায্য ছাড়াই। পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে বাবা একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেয়েকে সার্কাসে দিয়ে দেবেন। কিন্তু আয়েশা রাজি হননি। পড়ালেখার প্রতি জেদ আর স্বপ্নই তাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনে।
পা দিয়ে লিখে এসএসসি ও এইচএসসি- দুটি পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ পান আয়েশা। এরপর সাঘাটা উপজেলার উদয়ন মহিলা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ডিগ্রি পাস করেন। সম্প্রতি গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন, ফলাফলে আবারও প্রথম বিভাগ।
মাস্টার্স শেষ করে আয়েশা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য। পাশাপাশি বিনা পারিশ্রমিকে পড়াচ্ছেন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে আয়েশা সবার বড়। পরিবারের বাকিরা হয় পড়ালেখা করছে, নয়তো বাবার ছোট ব্যবসায় সাহায্য করছে। দুটি টিনের দোচালা ঘরই তাদের সম্বল। একটিতে থাকেন আয়েশা ভাইবোনদের নিয়ে, অন্যটিতে বাবা-মা।
আয়েশা বলেন, ছোটবেলা থেকেই সমাজের অন্য সবার মতো হতে চেয়েছি। তার অনেকটাই অর্জন করতে পেরেছি পড়ালেখা করে। বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে সহযোগিতা করার জন্য একটা সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখে এসেছি সবসময়।
বাবা আব্দুল লতিফ ও মা ফাতেমা বেগম জানান, ছোট থেকেই কষ্ট করে বড় হয়েছে আয়েশা। তাদের একটাই চাওয়া ছিল- মেয়েটি যেন অন্য সবার মতো স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, সমাজের বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়। সেই চেষ্টায় এখন পর্যন্ত সফল তাদের মেয়ে।
আয়েশার দীর্ঘ সংগ্রাম, চোখের জল আর সাফল্যের এই যাত্রা নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’। প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় নির্মিত এই তথ্যচিত্রের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা মল্লিক।
হাত নেই বলে যে জীবন থেমে থাকে না- আয়েশা আক্তার যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ। বাকি আছে শুধু একটি চাকরি, যা তার এত দিনের লড়াইকে দেবে পূর্ণতা।
উদয়ন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা আয়েশাকে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাধ্যমতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আয়েশা পড়ছে, এটা যেমন আমাদের গর্বের, তেমনি সে নিজেও সমাজে অন্য সবার মতো ভূমিকা রাখতে পারছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এএডি