মৃত্যুর পর শরীর সমাধিস্থ হয়, কিন্তু থেকে যায় অনলাইন ডেটা—ছবি, ভিডিও, ই-মেইল, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টসহ নানা ডিজিটাল পদচারণা। ইন্টারনেটে জীবনের স্মৃতিগুলো যেমন থাকে, তেমনি থেকে যায় ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যও। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সব কিছু মৃত্যুর পরে কে নিয়ন্ত্রণ করবে? কী হবে এই ডেটাগুলোর? এখনও এই প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই অনেকের কাছে।
গুগলের ইনঅ্যাকটিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার:
গুগল, ব্যবহারকারীদের ইনঅ্যাকটিভ অ্যাকাউন্ট পরিচালনার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টুল প্রবর্তন করেছে, যা “Inactive Account Manager” নামে পরিচিত। এই টুলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের অ্যাকাউন্ট দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে কী হবে তা নির্ধারণ করতে পারেন। গুগল ব্যবহারকারীদের বেছে নেয়ার সুযোগ দেয় যে নির্দিষ্ট সময় পর (যেমন ৩, ৬, ১২ অথবা ১৮ মাস) অ্যাকাউন্টটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে কে সেই অ্যাকাউন্টের তথ্য অ্যাক্সেস করতে পারবে এবং সেই তথ্য কীভাবে শেয়ার হবে। এমনকি, ব্যবহারকারী চাইলে তাদের অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলার নির্দেশ ও দিতে পারেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মৃত ব্যক্তির তথ্য বা অজ্ঞাত কারণে নিষ্ক্রিয় থাকা অ্যাকাউন্টগুলি অনেক সময় ব্যক্তিগত তথ্যের অপ্রত্যাশিত বা অনিচ্ছাকৃত শেয়ারিং ঘটাতে পারে।
ফেসবুকের মেমোরিয়ালাইজড অ্যাকাউন্ট:
ফেসবুকের ব্যবহারকারীরা মৃত্যুর পর তাদের প্রোফাইল “মেমোরিয়ালাইজড” করার সুবিধা পাচ্ছেন, যার মাধ্যমে একটি প্রোফাইল “Remembering” হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই ধরনের প্রোফাইলগুলো শুধু স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে কাজ করে, এতে নতুন কোনো পোস্ট বা আপডেট করা যায় না। তবে, ফেসবুক ব্যবহারকারীরা “Legacy Contact” নিযুক্ত করতে পারেন, যিনি মৃত্যুর পর তাদের প্রোফাইলের কয়েকটি নির্দিষ্ট কার্যাবলী পরিচালনা করতে পারবেন, যেমন—স্মৃতিচিহ্নের পোস্ট করতে বা প্রোফাইলের কিছু তথ্য অ্যাক্সেস করতে। ফেসবুকের এই নীতি এক প্রকার স্মৃতির রক্ষক হিসেবে কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন; RUFADAA:
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজিটাল সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য আইন রয়েছে, যার নাম “Revised Uniform Fiduciary Access to Digital Assets Act (RUFADAA)”।
এই আইনটি অনুমোদিত উত্তরাধিকারীদের মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পাওয়ার বৈধ উপায়। ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন ব্যাংকিংসহ অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদে প্রবেশ শুধুমাত্র তখনই সম্ভব, যখন মৃত ব্যক্তি পূর্বে অনুমতি দিয়ে যান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে এখনো ডিজিটাল সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট আইন বা নীতিমালা প্রণীত হয়নি। ফলে মৃত্যুর পর কারও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, ইমেইল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা ক্লাউডে সংরক্ষিত ডেটা ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবার বা কাছের মানুষরা প্রায়ই জটিলতার সম্মুখীন হন। এই আইনি শূন্যতা জনগণের ডিজিটাল অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাই আইনপ্রণেতাদের উচিত আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির নীতিমালা এবং অন্যান্য দেশের আইন অনুসরণ করে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক ডিজিটাল উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন করা।
ডিজিটাল যুগে অনলাইন উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। তবে মৃত্যুর পর এই ডিজিটাল ডেটাগুলোর কী পরিণতি হয়—এ প্রশ্ন এখনও অনেক ক্ষেত্রেই অনির্ধারিত। গুগল ও ফেসবুকের মতো কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সীমিত কিছু ব্যবস্থা চালু করেছে, যেমন অ্যাকাউন্ট মেমোরিয়ালাইজেশন বা ইনঅ্যাকটিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো ডিজিটাল সম্পদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কোনও নির্দিষ্ট আইন বা নীতিমালা নেই, ফলে এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব স্পষ্ট। ডিজিটাল উত্তরাধিকার কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।