রাজধানীর ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের দফায় দফায় বৈঠকের পরও সয়াবিন তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। উল্টো কয়েক দিন ধরে রাজধানীর বাজারগুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে খোলা সয়াবিন তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। নিত্যপণ্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে স্বস্তি নেই সবজি কিংবা মাংসের দোকানেও। সবজির দাম অনেক আগেই ‘সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়েছে, আর মুরগির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
গত রবিবার ভোজ্যতেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ওই বৈঠকে তিনি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তবে বৈঠকের দুই দিন পরই বাজারে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
এ ছাড়া সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কার কথা জানানোর পরই ভোজ্যতেলের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর হাতিরপুল, মোহাম্মদপুর ও মালিবাগের হাজিপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। বিশেষ করে ৫ লিটারের বোতল বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ২ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য।
মোহাম্মদপুরের খুচরা বিক্রেতা রহমান আলী জানান, ডিলাররা কয়েক দিন ধরেই পর্যাপ্ত বোতলজাত তেল সরবরাহ করছেন না। নিরুপায় হয়ে তারা এখন খোলা তেল বিক্রি করছেন। মালিবাগের ব্যবসায়ী মো. আফজাল হোসেন অভিযোগ করেন, কোম্পানির কাছে অর্ডার দিয়েও তারা তেল পাচ্ছেন না। এমনকি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা বাজারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের ধারণা, দাম বাড়ার আশায় কোম্পানিগুলো বাজারে তেল ছাড়া বন্ধ রেখেছে। সংকটের সুযোগে কিছু বিক্রেতা ২ লিটারের বোতল ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
বোতলজাত তেলের এই হাহাকারের প্রভাব পড়েছে খোলা সয়াবিন তেলের ওপর। খুচরা বাজারে এখন খোলা সয়াবিন তেল কেজিপ্রতি ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা মাত্র কয়েক দিন আগেও ১৯০ টাকা ছিল। বিক্রেতা রহমান আলী জানান, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। তবে সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, এটি একটি কৃত্রিম সংকট। অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় তেল মজুত করে রাখায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুল মোস্তফা বলেন, ‘বেতন পাওয়ার পর গত মাসের চেয়ে সস্তায় বাজার করার আশা করেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে দেখি বেতন প্রায় শেষ। প্রতি মাসেই কোনো না কোনো অছিলায় পণ্যের দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় বাড়ছে না।’ একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন ব্যাংক কর্মকর্তা অনিন্দ্য সরকার।
তিনি বলেন, ‘মাসে এক লাখ টাকা আয় করেও বাজারে এসে নিজেকে অসহায় মনে হয়। সবকিছুর দাম এত বেশি যে কঠোর পরিশ্রমের কোনো মূল্য খুঁজে পাচ্ছি না।’
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কড়া নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। মন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজারের অস্থিরতা কমেনি।
আমিষের বাজারেও বিরাজ করছে অস্বস্তি। ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও সোনালি মুরগির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত মাসের তুলনায় সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকার বেশি বেড়ে বর্তমানে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দাম ৮০০ টাকা ছুঁয়েছে। গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকা কেজিতে স্থির থাকলেও তা সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে। এমনকি ফার্মের মুরগির ডিমের দামও ডজনে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় ঠেকেছে।
সবজির বাজার যেন আরও তপ্ত। রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচাবাজারে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির কেজি ১০০ টাকার ওপরে। বেগুন ও করলা কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পটোল ও বরবটির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া ঢেঁড়স, চিচিঙ্গা, ধুন্দল ও শিম কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানিসংকটের কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সবজির দাম চড়া। তবে তুলনামূলকভাবে আলুর দাম কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের এই আকাশচুম্বী দামে রাজধানীজুড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ব্যবসায়ীদের কপালেও এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট।