• শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি, শেষ হওয়ারও নয়

ইনসাফ বার্তা ডেস্ক / ১০০ বার
আপডেট শনিবার, ১৭ মে, ২০২৫

আমরা ধরে নিই লোকটি একজন ফেরিওয়ালা। মাথায় তার চাঙারি, বিক্রি করে মাছ। গ্রামে নয়, শহরে- এই রাজধানীতেই। হাঁক দিয়ে যায় পাড়ায় পাড়ায়। কিন্তু একদা সে গ্রামে ছিল। জেলে নয়, চাষি। জমিজমা বেদখল ও ভাগাভাগি হয়ে গেছে। যা ছিল সেটুকু হাতছাড়া হওয়ার আগে বিক্রি করে দিয়ে এখন ফেরিওয়ালা হয়েছে। ভূমি এখন তার মাথায়, বিক্রি করে পাওয়া টাকাটাই পুঁজি। কত টাকার মাছ আছে তার ঝুড়িতে? হাজার তিনেক! কিন্তু সে মাছ খায় না। খাবার কথা স্বপ্নেও ভাবে না। তার স্ত্রী মাছ রান্না করছে, সে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে মাছে-ভাতে খাবার খাচ্ছে, এটা স্মৃতি হিসেবে ঝাপসা, স্বপ্ন হিসেবে সুদূরের। কিন্তু এখন সে পা রাখে কোথায়? জনাকীর্ণ, মানুষের ভারে ডুবু ডুবু ঢাকায় তার আশ্রয় কোনখানে? কোন বস্তিতে? আমরা জানি না। জানার আগ্রহ নেই। জানা সম্ভব নয়।

তবে এটা নিশ্চিত জানি যে ঈদ-পার্বণ এলে হাজার হাজার, হাজার কেন বলছি যে লাখ লাখ মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও গ্রামের দিকে ছুটে যায়, এ ফেরিওয়ালাটি তাদের একজন নয়। যারা বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে যে যেভাবে পারে গ্রামে ছুটে যাবে, সেখানে তাদের একটা আশ্রয় আছে, এ মানুষটির জন্য সেরকম কিছু নেই। এ লোকটি একেবারেই নিরাশ্রয়, তবে মনে মনে আর পাঁচজনের মতোই সে-ও গৃহী বৈকি। এ মানুষটি একা নয়, এমন হাজার হাজার, লাখ লাখ নরনারী রয়েছে এ শহরে। যাদের জীবনে কোনো ছুটি নেই, তাদের উৎসবও নেই। ছুটি নিলেই অনাহার। এরা পুঁজি যেটুকু আছে আঁকড়ে ধরে রাখে। কেননা তারা জানে, যে কোনো মুহূর্তে তা বেহাত হয়ে যেতে পারে। এদের পুলিশে গুঁতোয়, মাস্তানরা চাঁদার জন্য শাসায়। গ্রামে যদি আশ্রয় থাকত তাহলে জীবন বিপন্ন করে হলেও সেখানে ছুটত, যেমন লাখ লাখ মানুষ ছুটেছে। কেননা গ্রামের ওই আশ্রয়ে জীবন আছে বলে তারা মনে করত।

ছুটিতে ছুটতে ছুটতে পড়ি তো মরি হয়ে যারা দেশের বাড়িতে যায় তাদের আবার ঠিক ওভাবেই ফিরে আসতে হয়। সেই ঠেলাঠেলি ঠাসাঠাসি ধাক্কাধাক্কি-বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে। সেই ওষ্ঠাগত প্রাণ। সময়মতো না ফিরতে পারলে চাকরি যাবে। শহর থেকে বাড়িতে গিয়ে যখন পৌঁছেছে আপনজনেরা তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। সুবাতাস বয়ে যায় খুশির। কিন্তু তারাই, ওই আপনজনেরাই আবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যদি দেখে প্রিয়জনটির তাড়া নেই ঢাকায় ফেরার। তাহলে কি চাকরি নেই? কোনো সর্বনাশ কি ঘটে গেছে, যে জন্য বাড়িতে ফিরে এসেছে, ফেরত যাওয়ার জন্য উসখুস করছে না? এবং তারা স্বস্তি পায় যখন দেখে প্রিয়জনটি আবার রওনা হয়েছে আমরা ধরে নিই লোকটি একজন ফেরিওয়ালা। মাথায় তার চাঙারি, বিক্রি করে মাছবান্ধবহীন সেই মরুভূমিতে, রাজধানীর সেই অনিশ্চিত শহরে। কেননা প্রিয়জনেরা সবাই নিকটজন তো অবশ্যই কিন্তু উপার্জনে অক্ষম হলে সে অতি প্রিয়জনটি বাড়ির গাছটিও নয়, এমনকি শুকনো কাঠও নয়, যেন সে ঝরে পড়া পাতা একটি।

কিন্তু কেন এমনটা ঘটল? ঘটার প্রধান কারণ হচ্ছে উন্নতি। এ এক বিশেষ ধরনের উন্নতি, যাতে একজন ফুলেফেঁপে ফুড়ে সিঁড়ি ভেঙে খাড়াখাড়ি উঠে যায় ওপরের দিকে, আর অন্য ১০ জন সেই উন্নতির বোঝা বহন করতে গিয়ে নানা মাত্রায় অবনত হতে থাকে। এ উন্নতির আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে। সেটি হলো, আত্মকেন্দ্রিকতা। এক কথায় একে পুঁজিবাদী ধারার উন্নতি বলা খুবই সংগত। উন্নতির এ ধারায় ব্যক্তি যে নিজের মধ্যে সহৃদয়তা, সহমর্মিতা, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ইত্যাদিকে বিকশিত করবে, তা কিন্তু মোটেই সম্ভব নয়। উন্নতি এবং এসব মানবিক বিবেচনা মোটেই একসঙ্গে যায় না। উন্নতির সিঁড়ি ভাঙতে গেলে অবশ্যই এ ধরনের সব রকম বোঝা সবেগে নিচে নিক্ষেপ করতে হয়। নইলে পদে পদে আশঙ্কা থাকে কাত কিংবা চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়ার। মানবিক গুণাবলির চাঙারি কাঁধে বহন করে মস্ত বড় হয়েছে এমন কাহিনি এ যুগে রূপকথাতেও পাওয়া যায় না।

উন্নতির এ দর্শন নতুন কোনো বস্তু নয়। ব্রিটিশ যুগে এটি কার্যকর ছিল, পাকিস্তানি জমানায় বদলায়নি, স্বাধীন বাংলাদেশে একেবারে লক লক করে বেড়ে উঠেছে। উনবিংশ শতাব্দীতে যে নতুন শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল তখন প্রস্তাবনা ছিল এ রকমের যে একটা শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করলেই চলবে, সেই শ্রেণির কাছ থেকে শিক্ষা নিচের দিকে চুইয়ে চুইয়ে পড়তে থাকবে। এমনকি বিদ্যাসাগরের মতো শিক্ষা-অন্ত মহাপ্রাণ মানুষও শিক্ষার এ দর্শনে সাড়া দিয়েছিলেন। বহু লোককে নিম্ন মানের শিক্ষা না দিয়ে অল্প লোককে ভালো শিক্ষা দিলে তাতে দেশের মঙ্গল হবে বলে তিনিও বিশ্বাস করতেন। কেননা তারও ভরসা ছিল যে উৎকৃষ্ট শিক্ষায় যারা ধনী হবে তারা শিক্ষাবঞ্চিতদের সযত্ন প্রচেষ্টায় সুশিক্ষিত করে তুলবে। প্রতিবাদ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তিনি বলেছিলেন, শিক্ষা জল বা দুধ নয় যে ওপরে ঢাললে তা নিচে পৌঁছে যাবে। নিয়ম তো বরং এই যে শিক্ষা যতটুকু পাওয়া যাবে তা সুযোগপ্রাপ্তরাই নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে এবং এমন ব্যবস্থা করবে যাতে বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থাকে। বঞ্চিতদের শিক্ষিত করতে যাবে তারা কোন দুঃখে? প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি করে নিজেদের প্রাপ্ত সুযোগ খর্ব করার মতো মূর্খ তারা নিশ্চয়ই নয়। বাস্তবে এমনটাই দেখা গেছে এবং দেখা যাওয়াটাই স্বাভাবিক বটে।

শিক্ষার ব্যাপারে যা ঘটেছে উন্নতির ব্যাপারেও অবিকল সেটাই ঘটেছে। উন্নতরা তাদের প্রয়োজনে চাকরবাকর পাহারাদার দোকানদার এসব ধরনের চাকরি তৈরি করে। লোক খাটায়, কিন্তু লোকের সঙ্গে নিজেদের উন্নতি ভাগাভাগি করে নেবে এমনটা কখনোই হতে দেয় না। আর এই যে উন্নতি এর ফলে গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান নেই, সেখানে অভাব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের। গ্রামে নদী যেমন শুকিয়েছে তেমনি শুকিয়েছে উন্নতির সম্ভাবনা। জীবিকা অর্জনের সুযোগ নেই বলেই মানুষ শহরে ছোটে। শহর তাদের টানে, গ্রাম তাদের ঠেলে বের করে দেয়। সবটাই ঘটে উন্নতির মারাত্মক কারণে।

আমাদের দরকার সামাজিক যানবাহনের। চাই একতলা দোতলা বাস। দরকার কিছুটা মিটিয়েছে মেট্রোরেল। প্রয়োজন নৌপথে যাতায়াতের বন্দোবস্ত। কিন্তু উন্নতির যে ভয়াবহ খপ্পরে আমরা পড়েছি তার পক্ষে সামাজিক যানবাহনের ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়াটা যে কত কঠিন, ঢাকার রাজপথে তো প্রতিমুহূর্তেই তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাইভেট গাড়িগুলো চলছে না, পাবলিক বাসের জন্য শত শত পাবলিক লাইন ধরে প্রতীক্ষা করছে- এ দৃশ্য কার কাছে অপরিচিত? আমাদের উন্নতি প্রাইভেটে বিশ্বাস করে, পাবলিককে পারলে পিষে মেরে ফেলে, নুইসেন্স বিবেচনা করে। যে জন্য চিকিৎসা মানেই এখন প্রাইভেট হাসপাতালে ছোটা, সরকারি হাসপাতালে তারাই যায় যারা আমাদের ওই ফেরিওয়ালা বন্ধুটির দলে।

কিন্তু আমরা যারা এসব কথা বলছি তারা কী চাই? আকাক্সক্ষাটা কী? না, আমরা বড় কিছু চাই না, চাই সামাজিকীকরণ। যেমন যানবাহনের শ্রেণিবৈষম্য নিরসন। আমরা চাই গ্রাম যেন মানুষকে আশ্রয়স্থল থেকে উৎপাটিত করে শহরের দিকে ঠেলে না দেয়। তার জন্য প্রয়োজন হবে কর্মসংস্থানের, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের। ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা দরকার। নদী ও জলাশয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার চাই। চাই ফসলি বৃক্ষের সাহায্যে সামাজিক বনায়ন। চাইব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি, যাতে গ্রামে থাকাটা বিপজ্জনক বলে ধারণা না হয়। দরকার মফস্বলে উন্নত মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। চিকিৎসার উন্নয়নের জন্য আয়োজন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের। আমরা চাইব গ্রামকে শহরের দিকে টেনে না এনে শহর নিজেই গ্রামের দিকে রওনা দিক।

বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই নিতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসনকর্তা যে শাসকশ্রেণি তারা তো কিছুতেই চাইবে না যে, ক্ষমতা তাদের হাত থেকে জনগণের হাতে চলে যাক। তাদের চেষ্টা ক্ষমতা যেখানে থাকার সেখানেই থাকবে। ফেরিওয়ালা তার সম্পত্তি মাথায় করে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে, সম্পত্তিবানরা তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে চিন্তা দিয়ে মাথাভর্তি করে রাখবে। কিন্তু যে দেশে কয়েক কোটি মানুষের দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই, সে দেশকে কোন অর্থে স্বাধীন বলা যাবে সে প্রশ্নটা তো থাকবেই। আমরা তার মুখোমুখি হলে দায়িত্ব বাড়ে। আর সে দায়িত্বটা অন্য কিছুর নয়, আমাদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বটে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি, সহজে শেষ হবারও নয়।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরোও

Archive Calendar

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031