একসময় ট্রেন থামলেই যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকত প্ল্যাটফর্ম। কেউ ঢাকায় অফিস করতে যেতেন, কেউ ব্যবসার মালামাল নিয়ে ছুটতেন বিভিন্ন বাজারে। স্টেশনকেন্দ্রিক দোকানপাট, হোটেল ও ছোটখাটো ব্যবসাও ছিল জমজমাট। কিন্তু গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ইজ্জতপুর ও সাতখামাইর রেলস্টেশন এখন প্রায় পরিত্যক্ত। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে স্টেশন দুটি বন্ধ থাকায় জনজীবন, শিক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রীপুর ও গাজীপুর সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ইজ্জতপুর রেলস্টেশনটি ১৯৬৭ সালে চালু হয়। পরে লোকবল সংকটের কারণ দেখিয়ে প্রায় ১০ বছর আগে স্টেশনটি বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। একই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সাতখামাইর রেলস্টেশনও কয়েক দফা চালু ও বন্ধের পর বর্তমানে অচল অবস্থায় রয়েছে।
একসময় ইজ্জতপুর স্টেশনে ‘সিক্স ডাউন’, ‘এইট ডাউন’, ‘ফরটি ফোর ডাউন’ ও ‘অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস’সহ কয়েকটি ট্রেন দিনে আটবার যাত্রাবিরতি দিত। সেখানে টিকিট বিক্রি, মালামাল বুকিং ও যাত্রীসেবার সুযোগ ছিল। আশপাশের অন্তত ১২ থেকে ১৫টি গ্রামের মানুষ নিয়মিত এই স্টেশন ব্যবহার করতেন। প্রতিটি ট্রেনে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ যাত্রী ওঠানামা করতেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
অন্যদিকে সাতখামাইর রেলস্টেশন ছিল শ্রীপুর উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। বরমী, লোহাই, টেপিরবাড়ি, টেংরা বাজারসহ আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি ও বিভিন্ন মালামাল পরিবহনে এই স্টেশনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। শিক্ষার্থীরা শ্রীপুর সরকারি কলেজ, গাজীপুর শহর ও ঢাকায় যাতায়াতে ট্রেন ব্যবহার করতেন।
বর্তমানে স্টেশন দুটি বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত ভাড়া গুনে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় বেশি লাগছে, তেমনি বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছেন না তারা। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও পাইকারি মালামাল পরিবহনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইজ্জতপুর স্টেশনের সিগন্যাল ঘর, স্টেশনমাস্টারের কক্ষ, অপেক্ষাগার ও আবাসিক ভবন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত পড়ে আছে। প্ল্যাটফর্মজুড়ে ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে। কোথাও গবাদিপশু বেঁধে রাখা হয়েছে। স্টেশনসংলগ্ন বাজারটিও আগের প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়েছে। সাতখামাইর স্টেশনেও একই চিত্রনীরবতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে শ্রীপুর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর, ইজ্জতপুর, শ্রীপুর, সাতখামাইর ও কাওরাইদ এই পাঁচটি স্টেশনের মধ্যে শ্রীপুরের পর সাতখামাইর ছিল অন্যতম ব্যন্ত স্টেশন। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পুরো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০১৮ সালে দেশের ৫৯টি বন্ধ রেলস্টেশনের সঙ্গে সাতখামাইর স্টেশন পুনরায় চালু করা হলেও মাত্র এক বছরের মাথায় আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ইজ্জতপুর স্টেশনও দীর্ঘদিন ধরে অচল। স্টেশন দুটি চালুর দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।
এদিকে স্টেশন দুটি পুনরায় চালুর দাবিতে গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন এবং বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করেছেন। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় জনবল বিশেষ করে স্টেশনমাস্টার নিয়োগের পর স্টেশন দুটি পুনরায় চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, “শিল্পসমৃদ্ধ শ্রীপুরে দীর্ঘদিন দুটি রেলস্টেশন বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্টেশন দুটি চালুর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রæত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করছি।”
শ্রীপুর রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার সাইদুর রহমান বলেন, “ইজ্জতপুর ও সাতখামাইর স্টেশন চালু হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে। পাশাপাশি এই রুটে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থাপনাও আরও সহজ হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রæত স্টেশন দুটি পুনরায় চালু করা হলে এলাকার অর্থনীতি সচল হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে এবং হাজারো মানুষের যাতায়াত দুর্ভোগ কমে আসবে।