• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি: বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা

নিজস্ব প্রতিবেদক : / ১৩ Time View
Update : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে এমন কিছু চুক্তি ও সমঝোতা এগোচ্ছে, যার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক ও কৌশলগত চুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও বিতর্ক বাড়ছে। বিশেষ করে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিএসওএমআইএ) এবং অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট (এসিএসএ) নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও সমর্থনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এ চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন, তেমনি কেউ কেউ এটিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ বলেও মনে করছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হলে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি গ্রহণ এবং রসদ সরবরাহ করতে পারবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরকে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ বঙ্গোপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। নতুন এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। জানা গেছে, চলতি মাসের ৫ থেকে ৭ মে পর্যন্ত মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের কর্মকর্তারা ঢাকা সফর করেন। সফরকালে উভয় পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের কিছু তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়ও উঠে এসেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধার কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, কৃষি ও শিল্পখাতে সহযোগিতা বাড়ানোরও ইঙ্গিত মিলছে। তবে বিষয়টি ভারত ও চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ চীন থেকে আমদানি করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরশাসক হাসিনার একটি বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি একসময় দাবি করেছিলেন, বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিয়েছিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিল। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে নতুন করে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সক্রিয়তা বাড়লে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ও নৌ প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে। বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির বিষয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জনপরিসরে আলোচনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনগণকে বিস্তারিত না জানিয়ে এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বামধারার নেতা সাইফুল হক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কিছু শর্তের কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে। তাঁর মতে, এতে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর হলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে বলে তাদের ধারণা। এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসব চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়তে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কেউ মন্তব্য প্রকাশ করতে চাননি।
সরকারপক্ষের বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের অর্থনীতি, রফতানি এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা এটাও বলেছেন যে, বর্তমানে চীন যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি উন্নয়নের অংশীদার হতে চলেছে সেগুলো সব বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীনের বিষয়টি মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা ঠিক হবে না। তাতে দেশের উন্নয়নের যে স্বপ্ন সরকার দেখছে বা দেখাচ্ছে তা কোনো দিনও পূর্ণ হবে না। বরং দিন দিন ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি এখন শুধু সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বৃহৎ ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠছে। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা যে কোনো দেশের সঙ্গে একচেটিয়াভাবে এরকম চুক্তি করা ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে ভারত, চীন, রাশিয়া বা যে কোনো দেশ এমন সুবিধা চাইবে-এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে যারা চেয়েও পাবে না, তাদের সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি হতে পারে। বিভিন্ন দেশ সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যবহার করতে পারে উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তাহলে ভারত, চীন বা রাশিয়া চাইলে তাদেরকেও এমন সুবিধা দিতে হবে। এতে করে ভূরাজনীতি নিয়ে এটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে দেশের ওপর একটা চাপ আসতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031