• শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম

নির্বাচনী আমেজে মহান বিজয় দিবস উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক : / ৬২ বার
আপডেট বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠার আগেই জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকা লোকেলোকারণ্য। কুয়াশামোড়া ভোরের বুক চিরে ভেসে আসছিল নানা ধর্ম-বর্ণ-বয়সের মানুষের কলরব। শিশিরভেজা সড়কের ধারে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তারুণ্য; কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, কোথাও ছোট্ট শিশু চেপেছে বাবার কাঁধে, একরত্তি হাতে তার ফুলের তোড়া, মুখে রঙ, তাতে লাল-সবুজের বিজয় নিশান; কেউবা প্রিয়জনের হাত ধরে অপেক্ষমাণ। এ যেন লাল-সবুজে আঁকা শিল্পীর কোনো চিত্রপট। সবাই এসেছেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজ প্রাণ সঁপে দেওয়া বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। যাদের রক্তে লেখা হয়েছে ৫৬ হাজার বর্গমাইল অধ্যুষিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাস।

এ বছর মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনী আবহ স্পষ্টভাবেই প্রভাব ফেলেছে এবারের কর্মসূচিতে। শ্রদ্ধা নিবেদন, শপথ তথা দেশাত্মবোধক আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণা। সকাল থেকেই জাতীয় স্মৃতিসৌধে লক্ষ্য করা গেছে নির্বাচনী আমেজে দলগুলোর উপস্থিতি। বিশেষ করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা দলীয় স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন স্মৃতিসৌধ এলাকা। মনোনয়নবঞ্চিতরাও কম যাননি। বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক বেষ্টিত হয়ে তারাও রীতিমতো শোডাউন করেছেন।

৫৪ বছর আগে যে ভোরে একটি জাতি নতুন সূর্য দেখেছিল, বিজয়ের এই ভোরে এসে সেই সূর্যের আলো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে জাতি কি পারবে আরও দূরে এগিয়ে যেতে; বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে?

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের আনুষ্ঠানিকতা। সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি প্রথমে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করে মূল বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর পুষ্পস্তবক অর্পণের পর রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে দর্শনার্থী বইয়ে সই করেন রাষ্ট্রপতি।

সকাল ৬টা ৫৬ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর তিনি কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত চৌকস দল রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়, বিউগলে বাজে করুণ সুর।

এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা।

এরও পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। হাতে লাল সবুজের পতাকা, গালে আঁকা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ঢল নামে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। তাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে ভিড় করেন।

মহান বিজয় দিবসের সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে দলের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

এ দিন সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘রাজপথে বিজয়ে’

শীর্ষক যুব র‌্যালি ম্যারাথনের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান।

মহান বিজয় দিবসে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ স্মৃতিসৌধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম এবং ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

বিজয় দিবসে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এ তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি আর্টিলারি রেজিমেন্টের ছয়টি গান ব্যবহার করে ৩১ বার তোপধ্বনি করা হয়। এর মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গান স্যালুট প্রদর্শন করা হয়।

যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে মহান বিজয় দিবস উদযাপন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও (বিজিবি)। এ উপলক্ষে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দপ্তরসহ সারাদেশে বাহিনীর সব রিজিয়ন, প্রতিষ্ঠান, সেক্টর ও ইউনিটে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।

মহান বিজয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছবিতে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল সাধারণ শিক্ষার্থী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা গোলাম আযমের ছবিতে জুতা নিক্ষেপের পাশাপাশি ‘পাকিস্তানের দালালেরা, হুশিয়ার সাবধান’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের, এই বাংলায় ঠাঁই নাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘আগ্রাসনবিরোধী যাত্রা’ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর মোড় থেকে তাদের এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এনসিপির আগ্রাসনবিরোধী যাত্রায় নেতৃত্ব দেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। শাহবাগ, কাঁটাবন, নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে এই যাত্রা শেষ হয়।

মহান বিজয় দিবসে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীপ্ত শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে সংগঠনটির আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমানের পাঠানো যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, আমরা আজ বিজয় দিবসে একাত্তরের জনযুদ্ধে প্রাণ দেওয়া মহান শহীদদের স্মরণ করছি। সেই সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আজাদীর লড়াইয়ে আত্মোৎসর্গকারী আমাদের শহীদ পূর্বপুরুষদের স্মরণ করছি। এ ছাড়া চব্বিশের গণবিপ্লবে দিল্লির তাঁবেদার আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার দেড় সহস্রাধিক শহীদকেও আমরা স্মরণ করছি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব শহীদকে কবুল করে নিন এবং আজকের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাওফিক আমাদের দান করুন।

বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জবি প্রতিনিধি জানান, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। এ উপলক্ষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, বিজয় মিছিল, প্রতীকী
প্রতিবাদ কর্মসূচি, কবর জিয়ারত ও নৌ
র?্যালিসহ বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ, ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে গতকাল পাঠানো খবরে বলা হয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিনে বীর শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে চট্টগ্রামের আপামর জনতা। এ সময় তারা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই নগরীর উত্তর কাট্টলীতে অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদর্শন করে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরোও

Archive Calendar

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031