অর্থনৈতিক টানাপড়েন আর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে জাতীয় সংসদে আজ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের যাত্রায় বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি হতে যাচ্ছে। এর আগে সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হতো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়নের ইচ্ছা থেকেই বাজেটের আকার বড় হচ্ছে।
স্বৈরাচার হাসিনার ১৫ বছর ৮ মাসের শাসনামলের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থপাচারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নানাবিধ ভুলনীতির শিকার দেশের অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বিশ্ববাজারে টালমাটাল পরিস্থিতির আঁচ বহু আগেই লেগেছে দেশে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়ছে উত্তাপ। সর্বশেষ হিসেবে, দেশের মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। তাই সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া, করের বোঝা না বাড়িয়ে, নিত্যপণ্যের দাম কমানোর সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকুক আসছে বাজেটে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে থাকছে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন। রাজস্ব আয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যেখানে থাকবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও সুষম উন্নয়নের অঙ্গীকার। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকারের প্রথম বাজেটে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে দেশের সব খাতের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাজেটে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, দেশের রাজস্ব আদায়ের বর্তমান সক্ষমতা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নতুন বাজেটে যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। সরকারের নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাজেটের আকার নয়, বরং এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। পরিকল্পিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত না করা হলে বড় বাজেট কেবল অর্থনৈতিক চাপই বাড়াবে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ জন্য অর্থের যোগান দিতে বাজেটে আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। যার বেশিরভাগই আদায় করে দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। সরকারের উচ্চ বাজেট ব্যয়ের অর্থসংস্থান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এমনকি অর্থের সংস্থানকে বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ও। আর ঘাটতি থাকছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা পূরণে বিদেশি উৎস ও অনুদান থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। বাজেটে জিডিপির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে আটকে রাখতে চান অর্থমন্ত্রী। অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরো ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বড় বরাদ্দ থাকছে যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। বাজেটে ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।বাংলাদেশ সংবাদ
আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে। এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে সম্ভাব্য বরাদ্দ রাখা হতে পারে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকা-ে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আগামী দুই অর্থবছর তা বহাল রাখছেন অর্থমন্ত্রী। এবার এডিপির আকার বেড়ে দেড় গুণ হচ্ছে। এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেটের মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হবে। বাজেট প্রণয়নের নীতিগত কাঠামোতে পাঁচটি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতার বিকাশ।
এদিকে বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও নীতিনির্ধারকেরা আশা করছেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।