সবার চোখ এখন ইসলামাবাদের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক আলোচনার আয়োজক হতে যাচ্ছে পাকিস্তান। কিন্তু শনিবারের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগে নিরাপত্তার খাতিরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নিজেদের যুদ্ধবিমানের বিশাল এক বহর বা ‘এয়ার আর্মাডা’ মোতায়েন করেছে পাকিস্তান বিমান বাহিনী (পিএএফ)। মূলত ইসরায়েলি কোনো সম্ভাব্য হামলা বা ‘দুঃসাহসিকতা’ থেকে ইরানি প্রতিনিধিদের সুরক্ষা দিতেই এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
সূত্রমতে, ইরানের বিমান শক্তি যুদ্ধের কারণে প্রায় বিধ্বস্ত হওয়ায় দেশটির শীর্ষ প্রতিনিধিদের ইসলামাবাদ নিয়ে আসার দায়িত্ব নিয়েছে পাকিস্তান। এই অপারেশনকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ‘আয়রণ এসকর্ট’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলোকে ইরানের বন্দর আব্বাস শহরের কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা গেছে। যুদ্ধবিমানগুলো যেন দীর্ঘক্ষণ আকাশে থাকতে পারে, সেজন্য আইএল-৭৮ রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার মোতায়েন করা হয়েছে।পুরো আকাশসীমার ওপর কড়া নজরদারি রাখতে অ্যাওয়াকাস (আই ইন দ্য স্কাই) বা আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি বিমানগুলো শুধু ইরান নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের আকাশসীমার কাছেও টহল দিচ্ছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইসলামাবাদের গভীর প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
কেন এই বাড়তি সতর্কতা?
গত শুক্রবার পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় এই উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ ইসরায়েলকে ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে মন্তব্য করার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইরান থেকে আগত প্রতিনিধিদের বিমানে কোনো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক হামলা ঠেকাতেই পাকিস্তান তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করেছে।
শুধু আকাশপথ নয়, রাজধানী ইসলামাবাদকেও নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি জানিয়েছেন, বিদেশি অতিথিদের জন্য ‘ফুলপ্রুফ’ বা অভেদ্য নিরাপত্তার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পশ্চিম ও দক্ষিণ সীমান্তে পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হাই-অ্যালার্টে রাখা হয়েছে।
এত প্রস্তুতির মাঝেও আলোচনার টেবিল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় ইরানি প্রতিনিধি দল এখনো ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়নি বলে আল জাজিরা জানিয়েছে।
ইরান এবং পাকিস্তান দাবি করছে যে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক হামলায় অন্তত ৩০০ জন নিহত হয়েছে, যা আলোচনার পরিবেশকে মেঘাচ্ছন্ন করে তুলেছে।
ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদ বলেন, “সারা বিশ্ব অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে এই আলোচনার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এখন ইসলামাবাদের এই টেবিলের ওপর নির্ভর করছে।”
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক। এখন দেখার বিষয়, পাকিস্তানের এই বিশাল নিরাপত্তা বেষ্টনী পাড়ি দিয়ে ইরানি প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসেন কি না।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে