সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেরার পথে গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন নিবিড়ভাবে ইরানকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশাল এক বহর অগ্রসর হচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমরা ওই অভিমুখে অনেক জাহাজ পাঠাচ্ছি। আমি চাই না অপ্রীতিকর কিছু ঘটুক, তবে আমরা তাদের ওপর কড়া নজর রাখছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের একটি আর্মাডা (বিশাল রণতরি বহর) সেদিকে যাচ্ছে, হয়তো আমাদের এটি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না।’
এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার জন্য অঞ্চলজুড়ে প্রস্তুতি শেষ করার দিকে এগোচ্ছে। এর মধ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি পুনঃঅবস্থান, যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ নিতেও দেখা যাচ্ছে।
রয়টার্সকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ এবং বেশ কিছু গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী জাহাজ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এক কর্মকর্তা জানান, মার্কিন ঘাঁটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের কথাও ভাবছে ওয়াশিংটন।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর এই রণতরি মোতায়েন ট্রাম্পের সামরিক সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। উল্লেখ্য, গ্রীষ্মকালীন সেই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়েছিল। গত সপ্তাহে যখন যখন ইরানে বিক্ষোভ তুঙ্গে, তখন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে এই জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করে। তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন এই অশান্তিতে উসকানি দিচ্ছে।
ট্রাম্প বারবার বিক্ষোভকারীদের হত্যা না করার জন্য ইরানকে সতর্ক করেছেন এবং একপর্যায়ে মার্কিন হামলা বাতিল করা হয়। গত সপ্তাহ থেকে ইরানে বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহে দেশব্যাপী বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেন, মার্কিন সতর্কবার্তার পর ইরান প্রায় ৮৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, যদি তোমরা এই লোকেদের ফাঁসি দাও, তবে তোমাদের ওপর এমন আঘাত করা হবে যা আগে কখনো দেখনি। আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে করা হামলার চেয়েও সেটি হবে ভয়াবহ।’ তিনি দাবি করেন, ফাঁসি কার্যকরের মাত্র এক ঘণ্টা আগে তা বাতিল করা হয়েছে, যা একটি ভালো লক্ষণ। তবে ইরানের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মোভাহেদি গতকাল শুক্রবার ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা; এমন কোনো সংখ্যা বা বিচার বিভাগের এমন কোনো সিদ্ধান্তের অস্তিত্ব নেই।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে অর্থনৈতিক কষ্টের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রয়টার্সকে দেওয়া এক তথ্যে ইরানি এক কর্মকর্তা জানান, মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৫০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধানের হুঁশিয়ারি
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছেন, সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের পর বাহিনীটি এখন ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে প্রস্তুত’ অবস্থায় আছে।
বৃহস্পতিবার আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, তারা যেন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং ১২ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ থেকে পাওয়া শিক্ষা গ্রহণ করে কোনো ভুল হিসাব না করে–যাতে আরও যন্ত্রণাদায়ক ও অনুশোচনাজনক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।
তিনি বলেন, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও প্রিয় ইরান ট্রিগারে আঙুল রেখে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত–সর্বাধিনায়ক, আমাদের জীবনের চেয়েও প্রিয় এক নেতার (খামেনি) নির্দেশ ও ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রস্তুত। সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স