ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, লেবাননে সংঘাত এবং গাজা ইস্যু নতুন করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত।
তেহরানে পাকিস্তান সেনাপ্রধান, শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন গতি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টার মধ্যেই শুক্রবার তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। বৃহত্তর সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক দেশগুলো যখন কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াচ্ছে, তখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় মতপার্থক্য এখনো ‘গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ’ পর্যায়ে রয়েছে। তার মতে, আনুষ্ঠানিক কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর পথে বড় বাধা এখনো রয়ে গেছে।
এদিকে গাজায় সহায়তা বহরের কর্মীদের সঙ্গে ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষোভও বাড়ছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার আয়োজকদের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি অভিযানের পর আটক হওয়া অন্তত ১৫ জন কর্মী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। এ অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের শর্ত ও হরমুজে অবস্থান
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে নেওয়া ফি ও টোল আসলে তাদের দেওয়া ‘নিরাপত্তা সেবা’র অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি প্রত্যাখ্যান করে ইরান বলছে, হরমুজে এখন একটি ‘নতুন বাস্তবতা’ তৈরি হয়েছে এবং সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ বহাল রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, গত এক দিনে আইআরজিসির সমন্বয়ে ৩০টির বেশি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
একই সঙ্গে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘সব ফ্রন্টে’ যুদ্ধ বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ কোনো আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাদের মতে, শুধু ইতিবাচক কূটনৈতিক পরিবেশ কোনো চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন ‘সিদ্ধান্তমূলক’ পর্যায়ে রয়েছে। অতীতের পারমাণবিক আলোচনা যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার আলোচনা প্রকাশ্যে আনতে আগ্রহী নয় তেহরান। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশটি।
তেহরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেয়ে যুদ্ধ বন্ধ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান আলোচনায় যুদ্ধের অবসান, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার। পাকিস্তানের নেতৃত্বে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় কাতারের ভূমিকাও প্রশংসা করেছে তারা।
কূটনীতি অব্যাহত, তবে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে
ইরান ইস্যুতে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করেছে যে বড় ধরনের মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় ‘কিছু অগ্রগতি’ হলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে সমাধান আসেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটনের সামনে ‘অন্যান্য বিকল্প’ও রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনের চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জেসন ক্যাম্পবেলের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন সংঘাত ‘শিগগিরই শেষ হবে’, বিশ্লেষকদের মতে তেহরান বিশ্বাস করে তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চাপ সহ্য করতে পারবে। ফলে সময় যত গড়াবে, হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তত বাড়তে পারে।
লেবাননে উত্তেজনা, অর্থনীতিতে নতুন চাপ
লেবাননেও পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে দুই সামরিক কর্মকর্তাসহ নয়জনের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে একই সঙ্গে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখতে মধ্যস্থতাও চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।
এর মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী ও প্যারামেডিকও রয়েছেন। টাইর জেলার দেইর কানুন আন-নাহর, হান্নাউইয়াহ এবং নাবাতিয়েহ এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।
চলমান সংঘাত লেবাননের অর্থনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশটির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার থমকে যেতে পারে।
গাজা নিয়ে নতুন বিতর্ক
গাজা ইস্যুতেও উত্তেজনা বাড়ছে। হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা ওসামা হামদান অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু গাজা দখল নয়, বরং সেখানে ‘ফিলিস্তিনি উপস্থিতির অবসান’ ঘটানো।
হামাসকে নিরস্ত্র করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি ছাড়তে বাধ্য করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। তার এই মন্তব্য গাজা যুদ্ধ ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।