প্রশাসনিক কাজে গতি বাড়াতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ গুরুত্বপূর্ণ ৬ সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই আগের প্রশাসকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ৬ সিটি করপোরেশনে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা সবাই বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। মূলত নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন ‘রাজনৈতিক’ প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো। বিএনপির একটি সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার আমলাকেন্দ্রিক প্রশাসক নিয়োগ দিলেও কাজের গতিতে তেমন প্রভাব পড়েনি। এ ছাড়া গত দেড় বছরে সিটি করপোরেশনগুলোতে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়েছে। দলীয় নেতাদের এখন নিয়োগ দেওয়ায় এসব জটিলতা ক্রমেই কমে আসবে। যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এদের কেউ কেউ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে আলোচনা আছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন ‘যত দ্রুত সম্ভব’ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন দেওয়া হবে। কিন্তু এখন ৬ সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হলো।
এ ব্যাপারে গতকাল বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সরকারি কতগুলো নিয়ম কানুন আছে। সরকারি যেসব প্রথা আছে সে অনুযায়ী কতগুলোর মেয়াদ আছে, কতগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সবগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসে আমরা সরকারের তরফ থেকে একটা সঠিক সময়ে এই নির্বাচন দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তবে নিঃসন্দেহে এই নির্বাচনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন আবদুস সালাম। বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। তিনি অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব। পরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলেও আবদুস সালাম এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তবে ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএসসিসির মেয়র ছিলেন শেখ ফজলে নূর তাপস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দুই দিন আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শাহজাহান মিয়াকে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশাসকেরও দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গত বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে ডিএসসিসির প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় শাহজাহান মিয়াকে। গত নভেম্বরে এ পদে নিয়োগ পান মো. মাহমুদুল হাসান। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ডিএসসিসির প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুস সালাম।
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন শফিকুল ইসলাম খান। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএনসিসির মেয়র ছিলেন আতিকুল ইসলাম। ২০১৯ সালে তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্তির পর এই মাসের শুরুর দিকে সুরাইয়া আখতার জাহানকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন এ পদে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন শফিকুল ইসলাম খান।
খুলনা সিটির প্রশাসক মঞ্জু
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হন মঞ্জু।
খুলনা প্রতিনিধি জানান, ২০০৯-২০২১ সাল পর্যন্ত খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন মঞ্জু। ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর মঞ্জুর রাজনৈতিক জীবনে ছন্দপতন ঘটে। মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করলে বাদ পড়েন মঞ্জু ও তার অনুসারীরা। তবে পদ-পদবিতে না থাকলেও তারা বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত প্রতিটি কর্মসূচি ও বড় সমাবেশে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে মঞ্জু মাত্র পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এরপরই তার পরাজয়ের নেপথ্যে দলীয় কোন্দল সামনে আসে। তবে মঞ্জুকে কেসিসির প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী তাকে শুভেচ্ছা জানান।
সিলেট সিটির প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হলেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সিলেট ব্যুরো জানায়, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তার জায়গা স্থলাভিষিক্ত হলেন কাইয়ুম চৌধুরী। আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে মনোনয়ন পাননি। তিনি সিলেট জেলার সব কটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
নারায়ণগঞ্জ সিটির প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে নিয়োগ করেছে সরকার। সাখাওয়াত হোসেন খান মূলত সারা দেশে আলোচনায় আসেন সাত খুন মামলার পর। তিনি চাঞ্চল্যকর এ মামলাটিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী হয়ে বেশ আলোচিত হন।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত সাখাওয়াতকে বিএনপি সরকার নাসিকের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মূল্যায়ন করেছে বলে মনে করছেন মহানগর বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নাসিকের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, আমি দলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। বিগত দিনের ত্যাগের মূল্যায়ন করেছে দল। আমি চেষ্টা করব এই নগরীর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করার। নগরীর যানজট থেকে হকার সমস্যা এবং মাদক-সন্ত্রাসও নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক চেষ্টা করব। এসব কাজ নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়েই করব।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে টানা তিনবারের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে অতিরিক্ত সচিব এএইচএম কামরুজ্জামানকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তাকে বদলি করে যুগ্ম সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন সাখাওয়াত হোসেন খান।
গাজীপুর সিটির শওকত হোসেন সরকার
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার। তিনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং কাশিমপুর ইউনিয়নের বার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, শওকত হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবরে এলাকায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। এলাকাবাসী আশা প্রকাশ করেন, নতুন প্রশাসক গাজীপুরে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করবেন।
গাজীপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপির সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক এমএ মান্নান। এরপর সাবেক মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ও তার মা জায়েদা খাতুন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জায়েদা খাতুনকে বহিষ্কার করা হলে প্রশাসক হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরাফ উদ্দিন আহমেদকে নিয়োগ দেয় সরকার। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন শওকত হোসেন সরকার।
এ ব্যাপারে বাসন থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বশির আহমেদ বাচ্চু বলেন, শওকত হোসেন সরকার তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। এলাকায় কাজ করার তার দক্ষতা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন কারা নির্যাতিত ছিলেন। এখন সফলভাবে মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমরা গাজীপুরবাসি তাতে অনেক খুশি। আমাদের বিশ্বাস, গাজীপুরে বিদ্যমান নানা রকম সমস্যা সমাধানে শওকত হোসেন সরকার কাজ করতে পারবেন।