• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
নতুন ২ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত সরকারের খালেদা জিয়ার স্বাধীনতা পুরস্কার নিলেন জাইমা রহমান শূন্যপদ পূরণে ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে যা বললেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী গণতন্ত্র ছাড়া বাংলাদেশের সমৃদ্ধি সম্ভব নয় : স্পিকার বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুরু শুক্রবার মত-পথের পার্থক্য থাকতে পারে, তর্ক-বিতর্ক যেন শত্রুতায় রূপ না নেয় স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ইরানে চার ইসরায়েলি ‘গুপ্তচর’ গ্রেফতার প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা পদক হস্তান্তর করবেন আজ ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের ৭০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: শিক্ষামন্ত্রী

মিত্রহীন হয়ে পড়ছেন যুদ্ধবাজ ট্রাম্প

ইনসাফ বার্তা আন্তর্জাতিক : / ৫৪ বার
আপডেট মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সামরিক চাপ বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুদ্ধের ময়দানে যতটা আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন, কূটনৈতিক অঙ্গনে ততটা সমর্থন পাচ্ছে না তারা। হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে মিত্রদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানালেও ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে সাড়া না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। এমনকি বহুদিনের সামরিক জোট ন্যাটোর ভূমিকা নিয়েও প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক চাপ তৈরির প্রচেষ্টা এখন প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই এগোচ্ছে-যা চলমান সংঘাতের নতুন এক কূটনৈতিক বাস্তবতা সামনে আনছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধের ১৭তম দিনে এসে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুজাতিক সামরিক জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রশাসন। একইসঙ্গে অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলা বাড়তে থাকায় উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। ইসরায়েল বলছে, তাদের কাছে এখনও ইরানে হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু রয়েছে এবং যুদ্ধ অন্তত আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে।

হরমুজ প্রণালি পাহারায় জোটের ভাবনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চলতি সপ্তাহেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে পাহারা দিতে কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

এ উদ্যোগের পেছনে মূল লক্ষ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল সচল রাখা। ইরান ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজ এ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

তবে ট্রাম্পের আহ্বানে ইতোমধ্যে সাড়া না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ইউরোপের কিছু দেশ। জার্মানি ও গ্রিস জানিয়েছে, তারা এই সংঘাতে জড়াবে না এবং সামরিক শক্তি দিয়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার উদ্যোগেও অংশ নেবে না।

ন্যাটোকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প

যুদ্ধে সহযোগিতা না করলে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘খুবই খারাপ’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন মিত্রদের সহায়তা করেছে, এখন তাদেরও আমেরিকার পাশে দাঁড়ানো উচিত।

তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি মিত্র দেশ সংকটের শুরুতে সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এমনকি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে সহায়তা না করলে ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প আরও বলেন, এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিরাপদ রাখতে তিনি চীনের ওপরও চাপ বাড়াতে পারেন এবং এ লক্ষ্যে নির্ধারিত এক সম্মেলন পিছিয়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন।

ইরানের পাল্টা হুশিয়ারি

অন্যদিকে তেহরানও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লোহিত সাগরে মোতায়েন মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে সহায়তা করা যেকোনো কেন্দ্র ইরানের হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইরানের নৌ-সক্ষমতা ধ্বংস হয়নি এবং হরমুজ প্রণালি এখনও ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ‘আমেরিকান ও জায়নবাদী’ লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও তিন হাজার ৬০০ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান যতদূর প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।

সেজিল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, তেহরান প্রথমবারের মতো ‘সেজিল’ নামের কৌশলগত সলিড-ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এবং এর গতি শব্দের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি।

ইসরায়েলের হামলা ও যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা একইসঙ্গে ইরানের তেহরান, শিরাজ ও তাবরিজ শহরে বিস্তৃত আকারে হামলা চালাচ্ছে। এ ছাড়া তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ব্যবহৃত একটি উড়োজাহাজ ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, ইরানে এখনো হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে অন্তত তিন সপ্তাহের সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে।

ইসরায়েলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহারও সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে এবং আগামী দিনগুলোতে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

অঞ্চলজুড়ে হামলা ও উত্তেজনা

সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল দাহিয়ে হতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন একটি লজিস্টিক ক্যাম্পে ড্রোন ও কাতিউশা রকেট হামলা হয়েছে। ইরাকি কুর্দিস্তানের সুলাইমানিয়া অঞ্চলে ইরানি কুর্দি বিরোধী দল কোমালার অবস্থানে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে দেড় ঘণ্টায় ধেয়ে আসা ৩৭টি ড্রোন প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে। এদিকে ড্রোনসংক্রান্ত ঘটনার পর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

হতাহত ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১৫ ইসরায়েলি নিহত এবং তিন হাজার ৩৬৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে ইরাকে একটি সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর সদস্য টেইলার সিমনস নিহত হয়েছেন। এতে ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ইরানের পুলিশপ্রধান আহমাদরেজা রাদান জানিয়েছেন, শত্রুদের কাছে তথ্য সরবরাহের অভিযোগে দেশে ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা

এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সতর্ক করেছেন যে, অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা পুরো অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

অন্যদিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়াসল বিন ফারহান আল সৌদ-এর মধ্যে ফোনালাপে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ক্ষোভ

যুদ্ধসংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপরও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তার দাবি, ইরান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়াচ্ছে এবং কিছু মার্কিন মিডিয়া তা প্রচার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এমন মিডিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনার আহ্বান জানান।

সমঝোতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত

তবে উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় আসতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরান ‘মরিয়া হয়ে সমঝোতা করতে চায়’, যদিও তিনি মনে করেন, এখনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তারা প্রস্তুত নয়।

সব মিলিয়ে সামরিক সংঘর্ষ, কূটনৈতিক চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহ পথের নিরাপত্তা-এ তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক জোট গঠন এবং ইরানের পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরোও

Archive Calendar

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031