ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনি ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় সূচিত হলো। অতীতের সব রেকর্ড চুরমার করে দিয়ে প্রথম দফার ভোটে অভাবনীয় সাড়া দিলেন ভোটাররা।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজ্যের ১৫২টি আসনে এক ধরনের অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই বিপুল ভোটদান শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেও এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। রাজ্যের ১৬টি জেলার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসবের আমেজে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বিচ্ছিন্ন কিছু অশান্তির খবর ছাড়া প্রথম দফার এই ভোট গ্রহণ ছিল মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ও অবাধ। এই সফল আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনও এক ধরনের ‘লেটার মার্কস’ পেয়ে উত্তীর্ণ হলো।
ভোটার বাড়ার কারণ কী?
এবারের এই রেকর্ড ভাঙা ভোটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা যত স্বচ্ছ হয়, ভোটের হার তত বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। কমিশনের তথ্য বলছে, এই প্রক্রিয়ায় এবার এই রাজ্যের প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটার হয় মৃত অথবা অন্য স্থানে চলে গেছেন। এতদিন তারা তালিকায় ছিলেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮-৯ শতাংশ। এই ভুয়া ভোটারদের ছেঁটে ফেলার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভোটের শতাংশ আনুপাতিক হারে অনেক বেড়ে গেছে। এবার তালিকা পরিচ্ছন্ন হওয়ায় শতাংশের হিসেবে সেই প্রকৃত চিত্রটিই ফুটে উঠেছে।
ভোট বাড়ার আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো ভোটারদের মনে তৈরি হওয়া এক ধরনের আতঙ্ক। ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে, এবার ভোট না দিলে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব বা অন্য কোনো প্রশাসনিক সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে বহু দোদুল্যমান ভোটার এবার ভোটকেন্দ্রে ভিড় করেছেন। এমনকি ভিনরাজ্যে থাকা হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকও স্রেফ ভোটাধিকার রক্ষার তাগিদে বাড়ি ফিরে ভোট দিয়েছেন। তবে এসবের বাইরেও নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা প্রশংসার দাবি রাখে। ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বুথমুখী করার পেছনে কমিশনের ভূমিকা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
এই বিপুল ভোটদান কার পালে হাওয়া দিচ্ছে?
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল ভোটদান রাজনৈতিকভাবে কার পালে হাওয়া দিচ্ছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি পুরোনো তত্ত্ব হলো–বিপুল ভোট মানেই সরকারবিরোধী হাওয়া। সেই হিসাবে বিজেপির জন্য এটি আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিহারসহ বেশ কিছু রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে ভোটের হার বাড়া সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলই আবার ক্ষমতায় ফিরেছে। সাধারণ অর্থে বেশি ভোট পড়া মানেই কোনো একটি ‘ওয়েভ’ বা বড় ঝড়ের ইঙ্গিত। সেই ঝড় শাসকদলের পক্ষেও হতে পারে, আবার বিপক্ষেও যেতে পারে। যেহেতু এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতাও ভোটদাতাদের একটি অংশের মনে প্রভাব ফেলেছে। তাই এর সুবিধা তৃণমূল কংগ্রেসও পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তামিলনাড়ুতে ভোট পড়েছে ৮৪.৫১ শতাংশ
গতকাল পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি তামিলনাড়ু রাজ্য বিধানসভার সব কটি আসনেই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভোটার উপস্থিতির হারে তামিলনাড়ুকে পেছনে ফেলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তামিলনাড়ুতে ভোট পড়েছে ৮৪.৫১ শতাংশ, যেখানে বাংলায় সেই হার ৯১.৫৮ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে বাকিগুলোতে ভোট গ্রহণ হবে আগামী ২৯ এপ্রিল। সব কটি রাজ্যের ফলাফল একযোগে ৪ মে ঘোষণা করা হবে।
বাংলার জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা জোরালো ছিল। দক্ষিণ দিনাজপুরে সর্বোচ্চ ৯৩.১২ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ ছাড়া কোচবিহারে ৯২.০৭ শতাংশ, মুর্শিদাবাদে ৯১.৩৬ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৯০.৭ শতাংশ এবং বীরভূমে ৯১.৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এমনকি পাহাড়ি এলাকা দার্জিলিং ও কালিম্পংয়েও যথাক্রমে ৮৬.৪৯ শতাংশ ও ৮১.৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামের মতো জেলাগুলোতেও ভোটের হার ছিল ৯০ শতাংশের কাছাকাছি।