ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাহাদাতের পর বিশ্বজুড়ে এখন চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং ইরানের বিরোধী দলগুলো খামেনির এই মৃত্যুকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন বা সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সত্যিই কি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে যাচ্ছে? আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক ভিডিও প্রতিবেদনে এই প্রশ্নের পেছনের জটিল সমীকরণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ভিন্ন এক বাস্তবতা
আল জাজিরার সাংবাদিক সোরয়া লেনি তার প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেছেন, খামেনির মৃত্যু এবং ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যদিও বিরোধী গোষ্ঠী এবং অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক এটিকে পরিবর্তনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন, তবে বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং সুসংহত প্রশাসনিক, সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো। ইরানের আইআরজিসি বা রেভল্যুশনারি গার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা এবং প্রভাব রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে প্রোথিত। একজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তন আসলেও পুরো রাষ্ট্রকাঠামো বা আদর্শিক ভিত্তি তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়ার সম্ভাবনা কম।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
খামেনির মৃত্যুর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু দেশ একে ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি বড় মোড় হিসেবে দেখছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, লেবাননসহ প্রতিবেশী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের আঁচ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে আপাতত একতাবদ্ধ রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, খামেনির মৃত্যু ইরানের রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করলেও, এটিই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের চূড়ান্ত পতন ঘটাবে—এমনটি বলার সময় এখনো আসেনি। ইরানের শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
উল্লেখ্য, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর, দেশটি তার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হলে তা পূরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে বর্তমান যুদ্ধাবস্থা ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে।
সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হওয়ার সাথে সাথে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই কাউন্সিল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে।
এই কাউন্সিলে রয়েছেন ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য (যিনি এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল কর্তৃক মনোনীত)।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের একক ক্ষমতা রয়েছে ‘এক্সপার্ট অ্যাসেম্বলি’-এর হাতে। এটি ৮৮ জন সদস্যের একটি নির্বাচিত ধর্মীয় কাউন্সিল। এদের কাজ হলো সর্বোচ্চ নেতার যোগ্যতা পর্যালোচনা করা এবং নতুন নেতা নিয়োগ দেওয়া।
অ্যাসেম্বলিকে যত দ্রুত সম্ভব নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য অধিবেশন ডাকতে হবে। সাধারণত গোপন আলোচনার মাধ্যমে তারা সম্ভাব্য প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে চূড়ান্ত করা হয়। নির্বাচিত ব্যক্তিকে অবশ্যই একজন জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হতে হবে।