জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. আমির হোসেন ও কনেস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে তিন পুলিশ সদস্যকে। এছাড়া অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এই মামলার মোট আসামি ৩০ জন। তারা হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, রংপুরের কমিশনার মনিরুজ্জামান, এডিসি আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, এডিসি শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, এসি আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব, এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, রাফিউল হাসান রাসেল, হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, পোমেল বড়ুয়া, মাহাফুজুর রহমান শামীম, ফজলে রাব্বী, আখতার হোসেন, সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, বাবুল হোসেন, ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ, মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, নূর আলম মিয়া, মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু, আনোয়ার পারভেজ ও ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন।
তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই তিন আসামি বর্তমানে পলাতক।
তাছাড়া, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন পুলিশ সদস্য আরিফুর জামান জীবন, নয়ন ও মাধব পলাতক রয়েছেন।
এছাড়া রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু ও বেরোবি ছাত্রলীগ সভাপতি পামেল বড়ুয়ার ১০ বছর কারাদণ্ড; গ্রেপ্তার ছাত্রলীগ নেতা এমরান আকাশ, এডিসি আবু মারুফ হোসেন টিটু, এডিসি শাহা নুর আলম পাটোয়ারী, আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপের রংপুরের সভাপতি ডা. মো. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন, তুফান, আমু, বাবু, নুরুর আলম, নুরুন্নবী মন্ডল ও মাসুদুর হাসানের ৫ বছর কারাদণ্ড; মনিরুজ্জামান পলাশ, মাসুদুর শামিম, ফজলে রাব্বি, আরিফ, আকতার, ধনজয়, বাবুল হোসেন ও রাসেলের ৩ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বেরোবির সাবেক প্রক্টর মো শরীফুল ইসলামকে খালাস পেয়েছেন।
৩০ আসামির বিপরীতে ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদের বাবাসহ ২৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। পাঁচ মাস ২০ দিনে বিচার কাজ শেষ করে রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়।
এর আগে রায় ঘোষণা উপলক্ষে ছয় আসামিকে সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গত ৫ মার্চ রায়ের জন্য আজকে দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে গত ২৭ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন গত বছরের ২৬ জুন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করলে ৩০ জুন তা আমলে নেওয়া হয়।
মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমীর হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, বেরোবির প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী আকাশ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল এবং কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেল।
গত বছরের ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পলাতক আসামিদের পক্ষে গত ২২ জুলাই রাষ্ট্রীয় খরচে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন তীব্র হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।