যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সৃষ্ট ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান। দেশটি তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। এমন একটি সময়ে তারা এ অবস্থান নিয়েছে যখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাতের অবসান ঘটাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তেহরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত প্রতিনিধি গত মঙ্গলবার বলেন, অন্তত পাঁচটি আঞ্চলিক দেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তার দাবি, ওই দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর কর আরোপের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি প্রস্তাবও তুলেছে।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএ নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের সরাসরি ও পরোক্ষ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার। তবে তিনি ক্ষতির বিস্তারিত কোনো খাতভিত্তিক হিসাব দেননি। তিনি বলেন, পাকিস্তানে গত সপ্তাহে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতের আলোচনাতেও এটি গুরুত্ব পাবে।
সরকার জানিয়েছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এখনো পুরোপুরি মূল্যায়ন করা হয়নি। তেল-গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানা এবং সামরিক স্থাপনাগুলো বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এগুলো পুনর্গঠনে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া সেতু, বন্দর, রেলপথ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পানি লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্টেও সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে। অনেক হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। মোহাজেরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো সামর্থ্য সরকারের নেই।
ইরানের এয়ারলাইনস অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, ৬০টি বেসামরিক বিমান অচল হয়ে গেছে, যার মধ্যে ২০টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৬০টি যাত্রীবাহী বিমান চালু রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই বহু পুরোনো এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে যন্ত্রাংশের সংকটে রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, নওরোজ উৎসবের সময় যে আয় হওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশই হারিয়েছে বিমান সংস্থাগুলো। ৪০ দিনের যুদ্ধে তাদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ডলার। তেহরান, তাবরিজ, উরমিয়া ও খোররমাবাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বড় ধরনের ছাড় দেবে না, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি বলেছেন, ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো উচিত নয়। কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, ইরানের অধিকার স্বীকার করতে হবে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ, নতুবা যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে।
স্টকহোমভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সিপরি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ইরান প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক ব্যয় করেছিল। তবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির বাজেট চাপে রয়েছে।
অন্যদিকে সাত সপ্তাহ ধরে চলা প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধের কারণে অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এক ব্যবসায়ী নেতা জানান, ইন্টারনেট বন্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।
বর্তমানে সরকার ধাপে ধাপে ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সীমিতভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। আর সাধারণ মানুষ স্থানীয় নেটওয়ার্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে। কিছু গ্রাহকের জন্য ‘ইন্টারনেট প্রো’ নামে নতুন একটি সেবাও চালু করা হয়েছে, যা বেশি দামে তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা